শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
»
সংবাদ বিবরণী

আরিফের মৃত্যু: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতি কতটা?

বিশেষ প্রতিনিধি


ঢাকার মহাখালীস্থ আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের খাবার ও শারিরীক অবস্থার খোঁজ নিতে যাচ্ছিলেন তরুন প্রকৌশলী এবিএম আহসান উল্লাহ আরিফ। মুগদা থানাধীন টিটিপাড়ার বাসা থেকে বের হয়ে তিনি ওঠেন ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলে। হাতিরঝিল থানাধীন রেইনবো ক্রসিং পার হতেই পেছন দিক থেকে তার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয় এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ভারী মালামাল বহনের কাজে যুক্ত থাকা একটি ক্রেন। আরিফ পড়ে যান মোটরসাইকেল থেকে। আর ক্রেনের লোহার চাকা চলে যায় তাঁর কোমরের নিচের অংশের ওপর দিয়ে। আরিফের শরীরের রক্তে ভিজে যায় রাস্তার কালো পিচ। অধিকাংশ হাড়গোড় ভেঙ্গে যায় তার। ২০ মিনিটের মতো রাস্তায় পড়ে থাকেন আরিফ। পথচারিদের উদ্দেশ্যে বাঁচার আকুতি জানাতে থাকেন তিনি। কিš ‘তার সাহায্যে এগিয়ে আসেননি কেউ। বরং পথচারিদের কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন সেই মর্মান্তিক দৃশ্যের। কেউবা অভিযুক্তদের অভিশাপ দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে চলে যাচ্ছেন। হাত দুটি অক্ষত থাকায় পাশ থেকে যাওয়া জনৈক ব্যক্তির পা চেপে ধরেন আরিফ। হয়তো হৃদয় গলে তার। ওই পথচারি নিজের মোবাইল থেকে আরিফের ভাই ডা. এবিএম ইয়াসিন উল্লাহ শরীফকে ভাইয়ের দুর্ঘটনার বিষয়টি জানান। ডা. শরীফ তখন অবস্থান করছিলেন টাঙ্গাইলের নিজ কর্মস্থলে। তিনি কলদাতাকে অনুরোধ করেন আরিফকে অন্তত: হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। আরিফকে ওই পথচারি নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ভর্তি করা হয় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউতে)।


এ ঘটনা গত ১৮ অক্টোববের। সকাল তখন পৌঁনে ৮টা। শুধুই জীবন বাঁচানোর স্বার্থে আরিফের পা কেটে ফেলেন চিকিৎসক বোর্ড। শরীরে পুশ করা হয় ৪০ ব্যাগ রক্ত। তবুও বাঁচানো যায়নি আরিফকে। ৪ দিন পরে না ফেরার দেশে চলে যান আরিফ। ক্রেনটি আরিফকে এমনভাবে চাপা দেয় কোমর থেকে দুই পায়ের পুরো চামড়া পর্যন্ত উঠে যায়। নিহত আরিফের রয়েছে স্ত্রী এবং দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়ুয়া একমাত্র পুত্র সন্তান আরশ (৮)। অবুঝ শিশুটির কান্নায় যেন ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। অপরদিকে নিজের আদরের ধন হারিয়ে পাগলপ্রায় তার মা বয়োবৃদ্ধ মা সেলিনা বেগম। কোনো সান্তনাই যেন তাকে থামানো যাচ্ছে না। সন্তানের শোকে তিনি আজ মৃত্যুশয্যায়। আরিফের স্ত্রীও বাকরুদ্ধ। আর নিজে চিকিৎসক হয়েও ভাইকে বাঁচাতে না পেরে আক্ষেপে দিশেহারা ডা. শরীফ। এক আরিফের মৃত্যু যেন গোটা পরিবারকেই অজানা অন্ধকার গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শুধু তার পরিবারই নয়, শোকে স্তব্দ আরিফের বাসস্থান দক্ষিণ মুগদার বাসিন্দারা। মানবিক প্রকেশৈলী হিসেবে পরিচিত আরিফের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তারা। সবার একটাই প্রশ্ন কার অবহেলায় পুরকৌশলে স্নাতক করে নিজের যোগ্যতায় গড়ে তোলা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আরিফের এমন মৃত্যু হলো! আরিফের স্ত্রী ও সন্তানের সামনে এখন শুধুই অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন উঠেছে কে নিবে আরিফের ৮ বছরের সন্তান ও স্ত্রীর দায়িত্ব?। আর কার অবহেলায় মারা গেলেন আরিফ! শোকে স্তব্দ আরিফের পরিবারের প্রশ্ন কোনদিন কি এর বিচার পাবেন তারা। হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তরও মিলবে না। আরিফের এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী সাদেক হোসেন ভুঁইয়া বলছেন, সকাল আটটার দিকে সড়কে তেমন ভিড় ছিল না। শুধু মাত্র ক্রেন চালকের অবহেলা ছাড়া অন্য কোনো কারন ছিলো না আরিফের মৃত্যুতে। আরিফের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ক্রেনচালক গ্রেফতার হলেও এর আড়ালে থাকা অথবা দায়িত্বে অবহেলাকারিদের বিচার হবে কিনা তা নিয়ে সন্ধিহান নিহতের পরিবার।


তারা বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে কাজ করার সময় শুধু নিরাপত্তা বেষ্টনি নয়, বড় ধরনের ক্রেন চলাচলের সময় ওই ভারী যন্ত্রের সামনে দুজন সিগন্যালম্যান থাকার কথা অথচ নিরপত্তাজনিত কোন কোডই রাখা হয়নি।
এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজের নিরাপত্তার অবহেলাজনিত কারনে শুধু আরিফেরই মৃত্যু হয়নি। এর আগেও মৃত্যু হয়েছে নারী-শিশুসহ অনেকের। অথচ নিশ্চুপ কর্তৃপক্ষ। নিশ্চুপ সরকার। আর নির্বাক প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলো।
জানা গেছে, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো জেভি। দুর্ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট উত্তরায় বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের সময় ক্রেনের তার ছিঁড়ে একটি গার্ডার পড়ে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারের ওপর। তাঁরা এক আত্মীয়ের বৌভাতের দাওয়াত থেকে ফিরছিলেন। আর তখনই ক্রেনের তার ছিড়ে গার্ডারটি পড়ে প্রাইভেটকারের ওপর । এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান গাড়ির চালক রুবেল (৫০), ঝর্ণা (২৮), জান্নাত (৬), জাকারিয়া (২) এবং ফায়মা বেগম (৪০)। উত্তরার বিআরটি দুর্ঘটনার ঠিকাদার ছিল চীনা প্রতিষ্ঠান গাজুবা গ্রুপ করপোরেশন। উচ্চ পর্যায়ের তদন্তে প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এ পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়নি। আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।


এর আগে ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মগবাজার দিলু রোড এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজের স্টিলের মই নিচে পড়ায় নিহত হন পথচারী মতিউর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের বাসিন্দা ঢাকায় ফেরি করে গামছা, তোয়ালে ইত্যাদি জিনিস বিক্রি করতেন। দিলু রোড এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ ওপর থেকে স্টিলের মই পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন মতিউর।
মতিউরের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র একদিন পরেই তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কনটেইনার পড়ায় নিহত হন নির্মাণ শ্রমিক শামীম মিয়া। মৃত্যুর মাস তিনেক আগে কন্যা সন্তানের বাবা হন তিনি। আবার এর কয়েকদিন আগে হারান পিতাকে। সন্তানের পাশে থাকার সুযোগ হয়নি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার সাদাঘরকান্দির হতভাগা শামীমের। পরিবারের সদস্যদের খাবার জোটানোর তাগিদে তিনি ঢাকায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছিলেন। ক্রেন দিয়ে কনটেইনার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সময় সেটি এক্্রপ্রেসওয়ের ৩৪৮ ও ৩৪৯ নম্বর পিলারের মাঝে পড়ে যায়। এতে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে অবহেলাজনিত এমন দুর্ঘটনায় ২০২৩ সালের ২৯ মে মহাখালীতে নির্মাণকাজ চলার সময় ওপর থেকে রড পড়ে ১২ বছরের এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
সচেতনমহল বলছেন, আরিফ, শামীম, মতিউরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো রাজধানীর বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর বিশেষ করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জবাবদিহির দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। বাংলাদেশে উড়াল সেতু বা ফ্লাইওভার নির্মাণাধীন অবস্থায় একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে এসব দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।


এ ধরনের একেকটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হয়। তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু তদন্তের ফলাফল কখনো প্রকাশ হচ্ছেনা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন থেকে যান আড়ালেই। এসব ঘটনায় মামলা হলে শুধু শ্রমিক বা ঘটনার সময় যারা থাকেন তাদের বিরুদ্ধেই মামলা হয়। বরং অন্যরা এ সব ঘটনাকে পুঁজি করে আরো অর্থ লুটের ধান্ধায় থাকেন।
মানবাধিকার কর্মী ওয়ালিউল ইসলাম লোনা বলেন, নিরাপত্তায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর এসব ঘটনা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবহেলা আছে। নির্মাণ-সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় বারবার এমন প্রাণহানির ঘটনায় নানা মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। দাবি উঠেছে যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে নির্মাণকাজ চালানো ও ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন প্রকৌশলী বলেন, নির্মাণকাজে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিস্তারিত নির্দেশিকা আছে এবং ঠিকাদারদের তা মানা বাধ্যতামূলক। কোন ধরনের কাজে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হবে, তাও সেখানে বলা আছে। নির্মাণশ্রমিকের জীবন বীমা থাকাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকের বীমা তো থাকেই না, কাজের সময় চারপাশ ঘিরে রাখার নিয়মও অনেক ঠিকাদার মানেন না। তাঁর মতে, এ কারণেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের সেফটি কোড নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার সাথে সাথেই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই ধরনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়।

মন্তব্য করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top