শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা যে সমাজ, যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সেখানেই যেন কোনো শিশুকে নির্যাতন কিংবা বলাৎকারের শিকার হতে না হয়। ধর্মের শিক্ষা হোক মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও অসহায়ের সুরক্ষা—কোনো অপরাধ আড়াল করার ঢাল নয়। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনে মহান আউলিয়ায়ে কেরামের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে রাজধানীর নারিন্দায় মশুরীখোলা দরবার শরীফের ১০১তম ইসালে সাওয়াব মাহফিলে। একই সঙ্গে দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত কেবলা শাহ মুহাম্মদ আহসানুল্লাহ (রহ.)-এর জীবন, কর্ম ও ঐতিহাসিক অবদান সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর নারিন্দায় মশুরীখোলা দরবার শরীফে দিনব্যাপী এ মাহফিল ও দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠিত লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার পবিত্র কোরআনের হাফেজ ছাত্রদের দস্তারবন্দী (পাগড়ি প্রদান) অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মহান আউলিয়ায়ে কেরামের আদর্শ মানুষকে আত্মশুদ্ধি, মানবসেবা, ন্যায়বিচার ও দুর্বলের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, বলাৎকার এবং শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন গুরুতর অপরাধ। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার অজুহাতে কোনো অপরাধ আড়াল করার সুযোগ নেই। অভিযোগ উঠলে ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার করতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, মসজিদ, মাদ্রাসা, দরবারসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন, নিরাপদ অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা চালু এবং অপরাধের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নির্যাতিত শিশু ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
মাহফিলে মশুরীখোলা দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত কেবলা শাহ মুহাম্মদ আহসানুল্লাহ (রহ.)-এর জীবন, ঐতিহ্য এবং ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের কল্যাণে তাঁর অবদান নিয়ে দলিলভিত্তিক গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, তাঁর জীবন ও কর্মের যথাযথ সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবকল্যাণের শিক্ষা গ্রহণে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হযরত শাহ আহসানুল্লাহ (রহ.) ওয়াকফ এস্টেটের অষ্টম মোতাওয়ালি হযরত মাওলানা শাহ মুহাম্মদ আহছানুজ্জামান (রহ.)-এর ছোট সাহেবজাদা ও বর্তমান গদ্দিনশীন পীরসাহেব হাফেজ মাওলানা মুফতি শাহ মুহাম্মদ সাইফুজ্জামান (মা.জি.আ.)।
দিনব্যাপী আয়োজনে ওয়াজ মাহফিল, পবিত্র কোরআন খতম, ধর্মীয় আলোচনা ও জিকির মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দারুল উলুম আহসানিয়া কামিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ আল্লামা আবদুল কুদ্দুস ও শিক্ষক মাওলানা নিয়ামুল ইসলামের সঞ্চালনায় কোরআন-হাদিসের আলোকে আলোচনা করেন হযরত কেবলার খলিফাদের প্রতিনিধিরা, দারুল উলুম আহসানিয়া কামিল মাদ্রাসার সভাপতি ড. সৈয়দ শাহ এমরান, হযরত কেবলা শাহ আহসানুল্লাহ (রহ.) কমপ্লেক্সের সভাপতি শাহ মোহসেনুজ্জামান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা মুফতি আবু জাফর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বরেণ্য ইসলামী আলোচক পীরে তরিকত আল্লামা হাফেজ মাওলানা ওয়ালি উল্লাহ আশেকী এবং বেতাগী আস্তানা শরীফের পীরসাহেব আল্লামা গোলামুর রহমান আশরাফ শাহ।
এ ছাড়া আলোচনা করেন দারুল উলুম আহসানিয়া কামিল মাদ্রাসার সহ-অধ্যাপক মাওলানা আবুল বাশার, মুদাররিস মাওলানা মাকসুদুল হাসান আল আবেদী, মশুরীখোলা শাহ সাহেববাড়ি জামে মসজিদের খতিব মাওলানা সৈয়দ মাঈনুদ্দিন হেলাল, মশুরীখোলা আনজুমানে আহসানিয়ার সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ মাওলানা সৈয়দ বদরুদ্দোজা জুনায়েদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাওলানা তাওহিদুল ইসলাম এবং ঘরগাঁও দরবার শরীফের শাহজাদা মাওলানা আহসান আব্দুল্লাহ। জিকির মাহফিল পরিচালনা করেন নিজ পানুয়া দরবার শরীফের পীরসাহেব সৈয়দ বদরুল কামাল।
প্রতি বছরের মতো এবারও লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার হাফেজ ছাত্রদের পাগড়ি প্রদান করা হয়। এ সময় কয়েক হাজার মুসল্লি মাহফিলে অংশ নেন। তাঁদের জন্য দরবার শরীফের পক্ষ থেকে তাবারুকের ব্যবস্থা করা হয়।
শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দুই দিনের ইসালে সাওয়াব মাহফিলের সমাপ্তি ঘটে। মোনাজাত পরিচালনা করেন মশুরীখোলা দরবার শরীফের বর্তমান গদ্দিনশীন পীরসাহেব হাফেজ মাওলানা মুফতি শাহ মুহাম্মদ সাইফুজ্জামান (মা.জি.আ.)।





