বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
»
সংবাদ বিবরণী

সউদীতে বাংলাদেশি নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড: সোশ্যাল মিডিয়ায় যা প্রচার হচ্ছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার

সম্প্রতি সউদী আরবে বাংলাদেশি নারী-পুরুষের মৃত্যুদ- কার্যকরের ব্যাপারে বাক-স্বাধীনতার নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা প্রচার হচ্ছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দু’জনের কেউই উমরাহতে আসা দম্পতি নন। তারা উভয়ই মসজিদে হারামে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করতো। তাদের উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং এক পর্যায়ে মসজিদে হারামের ভেতর কিং ফাহাদ গেইট এর কাছাকাছি কোন এক নির্জন জায়গায় তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। এটা মক্কার অন্য কোন মসজিদে কিংবা কেবল একে অন্যকে চুমু দেয়ার ঘটনা ছিল না, যা অনেক প্রচার মাধ্যম বলে যাচ্ছে। যারা বাক-স্বাধীনতার নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লেখিত মৃত্যুদণ্ড নিয়ে নানা প্রপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। তিলকে তাল বানিয়ে জনগণের মাঝে যারা বিভ্রান্তি ছড়ায় তারা ভ্রাতৃ-প্রতীম উভয় দেশের সুসম্পর্ককে ফাটল ধরাতে চায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মহল এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছেলেটির নাম নজরুল ইসলাম। তার ফেইসবুকে প্রচারিত নিজের ছবি প্রমাণ করে সে মসজিদে হারামের পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করতো। এই ঘটনা ২০২৩ সালের। নিজেরা যিনায় লিপ্ত হবার আগে আরেক সহকর্মীকে পাহারায় রেখেছিল। সেই বন্ধু সুযোগে ভিডিও ধারণ করে রাখে। পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যকার দর-কষাকষি বা টানাপোড়েনে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তা কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যায়। সেই ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তিও বর্তমানে জেলে রয়েছে। এই হলো সঠিক ঘটনা। সউদী আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার ঘটনাটি ইসলামি আইন, পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা, বিচারিক জবাবদিহিতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্ব নিয়ে জনপরিসরে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, কোনো সংবেদনশীল ফৌজদারি মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সঠিক ও যাচাইকৃত তথ্য জানা কতটা জরুরি। গত ১৪ অক্টোবর সউদী আরব ঘোষণা করে যে, নজরুল ইসলাম আব্দুল বসির ও সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সউদী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার দায়ে আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করেছিল।

মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, আদালত ‘তাজির’ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের এমন একটি ধারার অধীনে এই মৃত্যুদ- প্রদান করে, যা নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারককে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগের সুযোগ দেয়। উচ্চতর কর্তৃপক্ষ এই রায় বহাল রাখে এবং রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে তা কার্যকর করা হয়। তবে, সরকারি ঘোষণায় ঠিক কী ধরনের ‘অনৈতিক কর্মকা-’ সংঘটিত হয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি; এমনকি বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।

এ ঘটনাটি সউদী আরবের আইন সমুন্নত রাখা এবং মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে- বিশেষ করে ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কার ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে, বিদেশে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত বিদেশি নাগরিকদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার, বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সউদী আরবের কাছে মসজিদগুলোর সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্থানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামি নীতি অনুযায়ী, মসজিদ হলো ইবাদতের স্থান, যেখানে মর্যাদা, সম্মান ও যথাযথ আচরণ বজায় রাখা আবশ্যক। তাই, এমন কোনো স্থানে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা। পাশাপাশি, কোনো নির্দিষ্ট শাস্তির আইনি ভিত্তি কী- তা সংশ্লিষ্ট বিচারিক রায় ও প্রযোজ্য আইনের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। যদিও ইসলামি আইন ঐতিহ্যে ‘তাজির’-এর আওতায় বিচারকের বিবেচনাবোধ প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে, তবুও আদালতের রায় এবং সেখানে প্রমাণিত তথ্যগুলো না জেনে কোনো নির্দিষ্ট মামলায় এ নীতির প্রয়োগ কতটা যথাযথ ছিল, তা পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এ পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমানে যে তথ্যগুলো ছড়িয়ে পড়ছে, তা সউদী সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় উল্লিখিত তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি। সউদী আরবের তায়েফ দাওয়াহ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত প্রচারক আব্দুর রাকিব মাদানির নামে প্রচারিত একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, ওই দুই ব্যক্তি বিন লাদেন গ্রুপে কর্মরত ছিলেন, তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ঘটনাটি রেকর্ড করেছিলেন এবং এ মামলার ঘটনাপ্রবাহ ২০২৩ সালের।

এছাড়া, অন্য এক ব্যক্তির কথিত আচরণ এবং তাকে দেয়া শাস্তি নিয়েও সেখানে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সউদী আরবের কাছে এই মৃত্যুদ- কার্যকর করার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে- অভিযোগসমূহ, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দণ্ড প্রদানের পেছনের পরিস্থিতি।

মন্তব্য করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top