Home > খেলাধুলা > ‘শিশুতোষ ভুলে’ বড় মাশুল!

‘শিশুতোষ ভুলে’ বড় মাশুল!

বাংলাদেশ কি ওই রান আউটের সুযোগ হাতছাড়া করে আফসোসে পুড়বে? নাকি নিজেদের লড়াকু মনোভাবে আত্মবিশ্বাসে জ্বালানি পাবে?

সাইফউদ্দিনের বল তাক করে ব্যাটে লাগালেন লোকি ফার্গুসন।  বল সীমানা পেরিয়ে যায়। গ্যালারি থমকে যায়। ওভালে হয় না কোনো উল্লাস, কোনো উৎসব। এতক্ষণ যে গ্যালারিগুলো লাল-সবুজের দখলে ছিল, বাংলাদেশ-বাংলাদেশ বলে চিৎকার করছিল, সেখানে নেই কোনো প্রাণ। হসপিটালিটি বক্সের বারান্দায় ফার্গুসনের বান্ধবী বসে ওয়াইন হাতে আনন্দ করেন। ওই চারে নিউজিল্যান্ডের জয়ের ব্যবধান নেমে আসে ১৮ বলে ১ রানে।  পরের ওভারের প্রথম বলে মুস্তাফিজকে সীমানা দিয়ে বাইরে পাঠান স্যান্টনার। জয় নিশ্চিত হয় নিউজিল্যান্ডের। হেরে যায় বাংলাদেশ।

মাশরাফিদের দেওয়া ২৪৫ রানের লক্ষ্যে নিউজিল্যান্ড জেতে মাত্র ১৭ বল আগে, ২ উইকেট হাতে রেখে।

অথচ ম্যাচের ভাগ্য এমন নাও হতে পারত যদি মুশফিক ‘শিশুতোষ’ ভুল না করতেন। তামিমের সরাসরি থ্রোতে যদি কেন উইলিয়ামসন রান আউট হতেন, তাহলে রস টেলরের সঙ্গে তার ১০৫ রানের জুটিটি হতো না। ৬ রানে শেষ হতো তাদের লড়াই। কিন্তু ওই জীবনে খাদের কিনারা থেকে দলকে যেভাবে তারা উদ্ধার করেছেন তাতেই যেন সব পাওয়া হয়ে যায় কিউইদের। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের সহজে জিততে দেয় না।  মিরাজের এক ওভারে উইলিয়ামসন ও ল্যাথাম বধ। মোসাদ্দেকের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের পর টেলর ও নিশামের উইকেট। সাইফউদ্দিন বলে মুশফিকের অকল্পনীয় ক্যাচ। তাতে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের লেট অর্ডার ব্যাটসম্যানরা দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। তাতেই বিশ্বকাপে দ্বিতীয় জয় তুলে নেয় নিউজিল্যান্ড।

কী দারুণ সেট আপটাই না করেছিলেন সাকিব। স্কোরবোর্ডে বড় পুঁজি নেই। তাই বোলিংয়ে শুরুতেই চাই উইকেট। সেটাও হলো না প্রথম ৫ ওভারে। ষষ্ঠ ওভারে বোলিংয়ে আসা সাকিবের শিকার চোখ রাঙানি দেওয়া গাপটিল (১৪ বলে ২৫)। দশম ওভারে সাকিবের ঘূর্ণিতে মিরাজের অসাধারণ ক্যাচে কলিন মানরো (৩৪ বলে ২৪) সাজঘরে।  নতুন দুই ব্যাটসম্যান কেন উইলিয়ামসন ও রস টেলরের জন্য আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাকিবের।

শর্ট লেগে মোসাদ্দেক। পয়েন্টের খুব কাছে মিরাজ, কাভারে মাশরাফি, মিড অফে তামিম, মিড অনে মাহমুদউল্লাহ। সাকিবের থেকে ‘বাঁচতে’ অধিনায়ক উইলিয়ামসনকে কী বিপদেই না ঠেলে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের ৪০০তম ম্যাচ খেলতে নামা টেলর। আলতো টোকা দিয়ে বল তামিমের কাছে পাঠিয়ে ভোঁ দৌড় টেলরের।শুরুতে সাড়া না দিলেও পরবর্তীতে বেরিয়েছিলেন উইলিয়ামসন। ফিল্ডিংয়ে থাকা তামিম বল লুফে চোখের পলকে থ্রো করলেন। উইলিয়ামসন ভেতরে প্রবেশের আগেই ভাঙল স্টাম্প।  কিন্তু উল্লাস নেই বাংলাদেশ শিবিরে! সাকিবের মাথায় হাত, তামিম বসে পড়লেন মাটিতে।অধিনায়ক মাশরাফির মুখ বিমর্ষ। মুশফিকের মুখে নেই হাসি।

তৃতীয় আম্পায়ার জোয়েল উইলসন রিপ্লে দেখে জানালেন নট আউট।  সবকিছুই তো পারফেক্ট হলো! তাহলে? তামিমের থ্রোতে স্টাম্প ভাঙার আগে মুশফিক শরীর দিয়ে ভাঙেন স্টাম্প। বেল পড়ে যাওয়ায় রান আউটের জন্য স্টাম্প উঠানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মুশফিকের মাথায় ওই মুহূর্তে তা আসেনি! হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়া হৃদয়ে প্রাণ ফিরে পান উইলিয়ামসন।  বাংলাদেশের ম্যাচ ওখানেই শেষ!

রস টেলর মাইলফলক ছোঁয়া ম্যাচটিতে করেন ৮২ রান। উইলিয়ামসনের ব্যাট থেকে আসে ৭২ বলে ৪০। দুজনের দুটি ভেঙেছিলেন মিরাজ।  তুলে মারতে গিয়ে মোসাদ্দেকের হাতে ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ দেন কিউই অধিনায়ক। ল্যাথামও একই ভুল করেন।  জায়গায় দাঁড়িয়ে মিরাজকে উড়াতে গিয়ে ক্যাচ দেন সাইফউদ্দিনের হাতে।  সেঞ্চুরির পথে হাঁটতে থাকা টেলরকে থামান মোসাদ্দেক। এজন্য মুশফিককে কৃতিত্ব দিতেই হবে।  লেগ স্টাম্পের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া বলে চুমু খায় টেলরের ব্যাট।  টাইমিংয়ে গড়বড় না করে মুশফিকও ধরে ফেলেন ক্যাচ।  ম্যাচের নায়ক টেলর ৯১ বলে করেন ৮২ রান।  এরপর সাইফউদ্দিনের স্লোয়ার বাউন্সারে মুশফিকের ওপর দিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন গ্র্যান্ডহোম। কিন্তু মুশফিক আবার দুর্দান্ত। ডানহাতে বল মুঠোবন্দী করেন।

নিশামের উইকেট নেন মোসাদ্দেক। সাইফউদ্দিন বোল্ড করেন হেনরিকে।  কিন্তু তাতেও জয় পায় না বাংলাদেশ। স্যান্টনার ১৭ রান করে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের লড়াইগুলো বেশ উত্তেজনা ছড়ায়। শেষ ওভার, শেষ বল, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলা যায় না কোন দল জিততে যাচ্ছে। বৈশ্বিক ক্রিকেটের মঞ্চে দুই দল উপহার দিল এমনই এক ম্যাচ।

এর আগে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে অল্পরানে আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল নিউজিল্যান্ডের। তাতে সফল কেন উইলিয়ামসনের বোলাররা। কিন্তু সাকিব যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন ততক্ষণ মনে হচ্ছিল ২৭০-২৮০ রান হয়ে যাবে অনায়াসে। কিন্তু হয়নি। সাকিবের ৬৮ বলে ৬৪ রানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯ রান করেন আটে নামা সাইফউদ্দিন। পাঁচ ব্যাটসম্যান আউট হয়েছেন ২০-র ঘরে। ভালো শুরুর পর কেউই দ্বায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারেননি।

সৌম্য প্রথম ম্যাচের মতো আজও আক্রমণাত্মক শুরু করেন। ৩ বাউন্ডারিতে মাঠ মাতান।  ভুল এক শটে ২৫ রানে বিদায় নিতে হয় তাকে।  সোজা ডেলিভারিতে ক্রস খেলতে গিয়ে বোল্ড হন হেনরির বলে। তামিম ৩ বাউন্ডারিতে ২৪ রানে ফেরেন ফার্গুসনের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে।  দ্রুত উইকেট হারানোয় চাপ আসে মুশফিক ও সাকিবের ওপরে।

তামিম আউট হওয়ার পর ১৯ বলে কোনো বাউন্ডারি আসেনি। মুশফিক গ্র্যান্ডহোমকে চার মেরে রানের গতি বাড়ান। এরপর দুই ব্যাটসম্যানই টুকটাক রান করে রানের চাকা সচল রাখেন। মূলত স্কোরবোর্ডে রান তোলার থেকেও তাদের মূল মনোযোগ ছিল উইকেটে থিতু হওয়া। সেই কাজটি করে তারা সফল। তাইতো মুশফিক ফ্লিক শটে বাউন্ডারি পান, স্কয়ার কাটে বল পাঠান সীমানার বাইরে। ২৩তম ওভারে সাকিব পরপর তিন বলে তিন চারে বাংলাদেশকে তিন অঙ্কের স্বাদ দেন। প্রথমটি পুল শটে। পরের দুটি পয়েন্ট দিয়ে। জিমি নিশামের ওই ওভারে বাংলাদেশ পায় ১৭ রান।

কিন্তু পরের ওভারে হঠাৎ ইউটার্ন। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবথেকে সফলতম জুটি ভাঙে ৫০ রানে, রান আউটে। স্যান্টনারের বল কাভারে ঠেলে রান নেওয়ার জন্য দৌড় দিয়েছিলেন মুশফিক। সাকিবও সাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে থমকে যান। মুশফিক রয়ে যান ক্রিজের বাইরে। গাপটিলের থ্রোতে উইকেট ভাঙেন লাথাম।  ১৯ রানে আউট হন মুশফিক।  তখন ভরসা ছিলেন একমাত্র সাকিবই।  মিথুনকে সঙ্গে নিয়ে বাঁহাতি স্পিনার গড়েন ৪১ রানের জুটি।  এ সময়ে সাকিব ৫৪ বলে তুলে নেন বিশ্বকাপে তার সপ্তম হাফ সেঞ্চুরি। হাফ সেঞ্চুরির পর বেশিদূর এগোতে পারেননি।  গ্র্যান্ডহোমের বল কাট করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন ৬৪ রানে।

সাকিব ফেরার পর ২৯ বলে কোনো বাউন্ডারি আসেনি।  দলকে বড় কিছু দিতে পারেননি মিথুন (২৬), মাহমুদউল্লাহ (২০), মোসাদ্দেক (২২)।  শেষ দিকে দলের প্রয়োজন মেটান সাইফউদ্দিন। হেনরির বলে বোল্ড হওয়ার আগে ২৩ বলে ৩ চার ও ১ ছক্কা হাঁকান।  ইনিংসের একমাত্র ছক্কাটি আসে ৪৫তম ওভারে সাইফউদ্দিনের ব্যাট থেকে।

শুরুতে সৌম্য, তামিম ও সাকিবদের চাপে রাখতে না পারলেও তাদের ফিরিয়ে মাঝপথে রানের চাকা আটকে দিয়েছিলেন কিউই বোলাররা। নিয়মিত উইকেটের সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ব্যাটসম্যানদের দিশেহারা করে ফেরেন ফার্গুসন, হেনরি, বোল্ট ও স্যান্টনাররা। টিম সাউদির পরিবর্তে খেলা হেনরি ৪৭ রানে নেন ৪ উইকেট। বোল্ট ৪৪ রানে নেন ২ উইকেট।

রান আউটের সহজতম সুযোগটি হাতছাড়া করে কঠিনতম মুহূর্তে নিজের আয়ত্বের বাইরের ক্যাচ ধরে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফিরিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম।  কিন্তু শেষ হাসিটা হাসতে পারেননি। স্বল্প পুঁজি নিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছিল বাংলাদেশ। হারার আগে হারেনি। হতে পারে এটাই এ ম্যাচে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ