বাংলাদেশের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করে সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়া

ক্রীড়া প্রতিবেদক : 

অ্যারন ফিঞ্চের সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়া ২৮৫ রান তোলার পর মনে হচ্ছিল রানটা একটু কমই হয়ে গেল। কিন্তু এই রান তাড়া করতে নেমেই যে ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস উঠে যাবে, তা কে জানত!

মিচেল স্টার্ক ও জেসন বেহরেনডর্ফের বোলিংয়ের সামনে এক বেন স্টোকস ছাড়া দাঁড়াতেই পারলেন না কোনো ইংলিশ ব্যাটসম্যান। ইংল্যান্ডকে সহজেই ৬৪ রানে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে গেল অস্ট্রেলিয়া। সপ্তম ম্যাচে ষষ্ঠ জয়ে অসিদের ১২ পয়েন্ট।

শ্রীলঙ্কার পর অস্ট্রেলিয়া- ইংল্যান্ড হারল টানা দুই ম্যাচ। শুরুতে যাদের ভাবা হচ্ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার, সেই ইংল্যান্ডের এখন সেমিফাইনালে ওঠাই হুমকিতে পড়ে গেছে। স্বাগতিকদের জন্য শেষ চারের সমীকরণটা ভীষণ কঠিন হয়ে গেছে। আর ইংল্যান্ডের হারে সেমিফাইনালের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে বাংলাদেশের। যেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানও।

লর্ডসে মঙ্গলবার ২৮৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করা ইংল্যান্ডের জন্য যে সহজ হবে না, সেটা জানাই ছিল। কিন্তু এতটা যে কঠিন হবে, তা হয়তো জানা ছিল না কারও!

ইংলিশদের শুরুটা হয় দুঃস্বপ্নের মতো। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে বেহরেনডর্ফের দারুণ এক ইন-সুইঙ্গারে বোল্ড হন জেমস ভিন্স। একটু পর স্টার্কের দারুণ এক ইন-সুইঙ্গারে এলবিডব্লিউ জো রুট। স্টার্কের পরের ওভারে শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ফাইন লেগে প্যাট কামিন্সের দারুণ ক্যাচে ফেরেন অধিনায়ক মরগান।

ছয় ওভারের মধ্যে তখন ২৬ রানেই নেই ইংল্যান্ডের ৩ উইকেট! জনি বেয়ারস্টো দারুণ কয়েকটি চার মারলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ৩৯ বলে ২৭ রান করা ইংলিশ ওপেনারকে থামান বেহরেনডর্ফ। ৫৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন ভীষণ বিপদে ইংল্যান্ড।

এরপরই স্টোকসের লড়াই শুরু। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান প্রথমে জস বাটলারের সঙ্গে গড়েন ৭১ রানের জুটি। ২৭ বলে ২৫ রান করা বাটলারকে ফিরিয়ে এ জুটি ভাঙেন মার্কাস স্টয়নিস। অবশ্য উসমান খাজার অবদানও কম নয় এই উইকেটে। ডিপ স্কয়ার লেগে বাউন্ডারিতে দারুণ এক ক্যাচ নেন খাজা।

ষষ্ঠ উইকেটে ক্রিস ওকসের সঙ্গে ৫৩ রানের আরেকটি জুটি গড়ে ফেলেছিলেন স্টোকস। তিনি নিজে এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। তবে আক্রমণে ফিরে দারুণ এক ইয়র্কারে স্টোকসকে থামান স্টার্ক। ১১৫ বলে ৮ চার ও ২ ছক্কায় ৮৯ রানের ইনিংস সাজান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।

এরপর নিয়মিত বিরতিতেই উইকেট হারিয়েছে ইংল্যান্ড। মঈন আলী, ওকস ও জোফরা আর্চারকে ফিরিয়ে বেহরেনডর্ফ পূর্ণ করেন পাঁচ উইকেট। আর আদিল রশিদকে ফিরিয়ে ২২১ রানে স্বাগতিকদের ইনিংস গুটিয়ে দেন স্টার্ক। এই ম্যাচেই দলে ফেরা বেহরেনডর্ফ ৪৪ রানে নেন ৫ উইকেট। স্টার্ক ৪৩ রানে ৪ উইকেট।

এর আগে ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নারের ১২৩ রানের উদ্বোধনী জুটিতে বড় সংগ্রহের ভিত পেয়েও তিনশ ছাড়াতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ৩০ ওভারে অসিরা ১ উইকেটে তুলেছিল ১৬২ রান। কিন্তু শেষ ২০ ওভারে ১২৩ রান তুলতেই হারায় ৬ উইকেট।

রাতভর বৃষ্টির পর সকালে মেঘলা আকাশের নিচে টস জিতে বোলিং নিয়েছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক এউইন মরগান। স্বাগতিকরা ব্রেক থ্রু পেতে পারত দ্বিতীয় বলেই। ক্রিস ওকসের বলটা লেগেছিলেন ফিঞ্চের ব্যাটের কানায়, তবে বল চলে যায় দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়ানো জো রুটের মাথার একটু ওপর দিয়ে।

একটু পর সুযোগ এসেছিল আরেকবার। এবার ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ডান দিকে ঝাঁপিয়েও ফিঞ্চের ক্যাচটা নিতে পারেননি জেমস ভিন্স। ১৫ রানে জীবন পেয়ে এগিয়ে যান ফিঞ্চ। ওয়ার্নার শুরুতে ছিলেন সাবধানী। প্রথম ১০ ওভারে আসে মাত্র ৪৪ রান। এরপরই বাড়ে রান তোলার গতি। অস্ট্রেলিয়া শতরান পূর্ণ করে ১৭ ওভার ৫ বলেই।

ফিঞ্চ ফিফটি তুলে নেন ৬১ বলে, ওয়ার্নার ৫২ বলে। ফিফটির পর ওয়ার্নার ইনিংস বড় করতে পারেননি। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে ১২৩ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন অফ স্পিনার মঈন আলী। ৬১ বলে ৬ চারে ওয়ার্নার থামেন ৫৩ রানে।

দ্বিতীয় উইকেটে উসমান খাজার সঙ্গে ৫০ রানের আরেকটি ভালো জুটি গড়েন ফিঞ্চ। খাজার বিদায়ে ভাঙে এ জুটি। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান বেন স্টোকসের বলের লাইন মিস করে বোল্ড হন ২৩ রানে।

স্টিভেন স্মিথের সঙ্গে জুটি বেঁধে ফিঞ্চ এরপর তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি, ১১৫ বলে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৫তম আর এবারের বিশ্বকাপে তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। তবে সেঞ্চুরির পরের বলেই ফেরেন আর্চারকে হুক করতে গিয়ে ফাইন লেগে ক্যাচ দিয়ে। ১১৬ বলে ১১ চার ও ২ ছক্কায় ১০০ রানের ইনিংসটি সাজান অসি অধিনায়ক।

এরপর নিয়মিত বিরতিতেই উইকেট হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আর্চারকে টানা ছক্কা-চার হাঁকিয়ে ঝড় তোলার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরই তিনি মার্ক উডকে আপার কাট করতে গিয়ে ফেরেন উইকেটকিপারকে ক্যাচ দিয়ে, ১২ রানে।

স্মিথের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউটে কাটা পড়েন মার্কাস স্টয়নিস। ব্যাটিংয়ে নামার পর থেকেই ইংলিশ সমর্থকদের দুয়ো শুনতে থাকা স্মিথও এরপর বেশিক্ষণ টেকেননি। ওকসকে মিডউইকেট খেলতে চেয়ে প্রাক্তন অসি অধিনায়ক ক্যাচ দেন লং অনে। ৩৪ বলে ৫ চারে স্মিথ করেন ৩৮ রান।

শেষ পর্যন্ত সংগ্রহটা যে ২৮৫ হয়েছে, সেটার পুরো কৃতিত্ব অ্যালেক্স ক্যারির। ২৭ বলে ৫ চারে ৩৮ রানে অপরাজিত ছিলেন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। ৪৬ রানে ২ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের সেরা বোলার ওকস। আর্চার, উড, স্টোকস ও মঈন নেন একটি করে উইকেট।

শেষ দিকে ইংলিশ বোলাররা দারুণ বোলিংয়ে লক্ষ্যটা নাগালেই রেখেছিলেন। কিন্তু ব্যাটসম্যানদের মধ্যে স্টোকস ছাড়া দায়িত্ব নিতে পারলেন না কেউই। ইংল্যান্ডও তাই পাত্তা পেল না অস্ট্রেলিয়ার কাছে।

১৯৯২ আসরের পর বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে কখনো হারাতে পারেনি ইংল্যান্ড। ইতিহাস বদলাল না এবারও। শেষ দুই ম্যাচের প্রতিপক্ষ যারা, সেই ভারত-নিউজিল্যান্ডকেও গত ২৮ বছরে বিশ্বমঞ্চে হারাতে পারেনি ইংলিশরা!

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া: ৫০ ওভারে ২৮৫/৭

ইংল্যান্ড: ৪৪.৪ ওভারে ২২১

ফল: অস্ট্রেলিয়া ৬৪ রানে জয়ী

ম্যান অব দ্য ম্যাচ: অ্যারন ফিঞ্চ।

%d bloggers like this: