Home > রাজনীতি > ১৯ জানুয়ারি কী ঘটবে ছাত্র ইউনিয়নে

১৯ জানুয়ারি কী ঘটবে ছাত্র ইউনিয়নে

দেশের বামপন্থী সংগঠন ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ এখন অন্তর্কোন্দলে বিপর্যস্ত। দলটির নেতা-কর্মীরা কার্যত ৩ অংশে বিভক্ত। সম্প্রতি গঠিত নতুন কমিটি নিয়ে বিরোধ আলোচনার টেবিল ছাপিয়ে এখন প্রকাশ্যে। মাঠে আছে শোডাউন-পাল্টা শোডাউন। অনলাইনে চলছে বাক্‌যুদ্ধ। তবে, দুপক্ষের শীর্ষ নেতারাই সংকট সমাধানের বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন। এরইমধ‌্যে ছাত্র ইউনিয়নের চলমান সংকট নিরসনে ১৯ জানুয়ারি বৈঠক ডেকেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সংগঠনের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নজর এখন ওই দিনের দিকেই।

ছাত্র ইউনিয়ন নেতা-কর্মীরা বলছেন, সংগঠন ৩ গ্রুপে বিভক্ত। এর মধ‌্যে ২ গ্রুপই নিয়ন্ত্রণ করেন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) শীর্ষ কয়েকজন নেতা। সম্মেলন এলেই চাঙা হয়ে ওঠেন তারা, স্পষ্ট হয় কোন্দল, দৃশ্যমান হয় দ্বন্দ্ব। সবশেষ ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনেও হয়েছে দ্বন্দ্ব দৃশ‌্যমান হয়ে ওঠে। এর আগের দুই সম্মেলনেও ভাঙচুর, মারামারি হয়েছে। আর তৃতীয় পক্ষ পার্টির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, বরং ছাত্র ইউনিয়নে সিপিবির প্রভাব বিস্তারের বিরোধী।

গত নভেম্বরে ৪০তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ২২৬ কাউন্সিলরের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এই সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনের তৃতীয় দিন শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট শুরু হলে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। ভোটের আগেই কাউন্সিল বয়কট করে বেরিয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগর কমিটির একাংশ। তাদের সঙ্গে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলা সংসদের নেতা-কর্মীরা। কাউন্সিলের পর ভোটে নির্বাচিত কমিটিকে মেনে নিয়ে অভিনন্দনও জানান তারা।

তবে, ওই পক্ষ দেড় মাসের মাথায় নতুন সম্মেলনের দাবি তোলে। এজন্য ১১৪ জনের স্বাক্ষরও কেন্দ্রীয় কমিটিতে জমা দেয়। কয়েকজনের স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়লে কেন্দ্রীয় কমিটি ওই নতুন সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৩ জানুয়ারি টিএসসিতে সভা করেন ৫৩ জন কাউন্সিলর। ওই সভা থেকে নতুন সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়। বিদ্রোহী এই অংশটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলও করে।

বিদ্রোহী অংশটির শীর্ষ নেতা বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মিখা পেরেগু বলেন, ‘‘প্রতিনিধি সভা থেকে নতুন করে ৪১তম জাতীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১৫ সদস্যের ‘সম্মেলন প্রস্তুতি সমন্বয় পরিষদ’ করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ও অন্যান্য বিষয় জানিয়ে দেবে।’’

৩ ভাগে বিভক্ত ছাত্র ইউনিয়ন
ছাত্র ইউনিয়নে বিরাজমান পক্ষগুলোর একটি অংশের নেতৃত্বে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল। এই পক্ষের সঙ্গে ঢাকার বড় ৩ ইউনিট; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের মূল নেতৃত্বের একাংশের সমর্থন নেই। এই পক্ষের একাধিক নেতার মতে, দেশের বেশিরভাগ জেলা সংসদের সমর্থন রয়েছে।

দ্বিতীয় পক্ষটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক ও নতুন কমিটির সদস্য অনিক রায় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাবেক সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয়। তার প্রতি ছাত্র ইউনিয়নের শীর্ষ ৩ ইউনিটের মূল নেতৃত্বের একাংশের সমর্থন রয়েছে। পাশাপাশি দেশের মফস্বলে থাকা কাউন্সিলরদের একটি অংশেরও সমর্থন রয়েছে। তবে, কাউন্সিলের ভোটে এই প্যানেলটি হেরে গিয়েছিল। এই অংশের ৫৩ জন প্রতিনিধি ১৩ জানুয়ারির সভায় অংশ নিয়েছিলেন।

তৃতীয় পক্ষ এই দ্বন্দ্বে অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। তারা দ্বন্দ্বে না জড়ালেও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এই অংশটির নেতৃত্বে আছেন ঢাকা জেলা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের নেতারা।

দ্বন্দ্বের নেপথ্যে সিপিবির শীর্ষ নেতারা?
ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি গঠন নিয়ে চলমান দ্বন্দ্বটি বেশ পুরানো। এর পেছেন সিপিবির শীর্ষ নেতৃত্বের ইন্ধন রয়েছে বলে ছাত্র ইনিয়নের একাধিক শীর্ষ নেতা অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, সিপিবির সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মঞ্জুরুল আহসান খান ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন। যিনি সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রশংসা করে একটি জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখে দল থেকে ৬ মাসের জন্য অব্যাহতি পেয়েছেন। ওই নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত অনিক রায় ও নজির আমিন চৌধুরী জয় নতুন সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। এই বিষয়ে মঞ্জুরুল আহসান খানকে ফোন করা হলেও তিনি কোনো মন্তব‌্য করতে রাজি হননি।

ছাত্র ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল, সিপিবির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমের অনুসারী বলে পরিচিত। তবে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিপিবি সাধারণ সম্পাদককে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি
রিসিভ ধরেননি।

সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্থ। করোনায় আক্রান্ত। ছাত্র ইউনিয়ন একটি গণসংগঠন। তাদের বিষয়ে কোনো উত্তর দেবো না। ছাত্র ইউনিয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে যেকোনো আলাপ তাদের নেতাদের সঙ্গে করুন।’

বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে বিতর্কিতরাই!
১৯ জানুয়ারি টিএসসির মুনীর চৌধুরী মিলনায়তনে বৈঠক করা ৫৩ কাউন্সিলরের নেতৃত্বে রয়েছেন বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কমিটির সদস্য অনিক রায়। তার সঙ্গে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাবেক সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয়। ওই বৈঠক থেকে তারা নতুন করে সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তিরও অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ আছে, এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বাইরের কেউ গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয়ই উনিটের নেতৃত্বে উঠে আসতে পারেননি। অনিক রায়ের অনুসারিরা শীর্ষ ইউনিটগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও এবার সাধারণ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ফয়েজ উল্লাহ ও দীপক শীল নির্বাচিত হয়েছেন। হেরে যাওয়ার পর কমিটিও মেনে নেন তারা। তবে, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিতে রিকুইজিশন সম্মেলনের দাবি তোলেন বলে ছাত্র ইউনিয়নের একজন সহ-সভাপতি অভিযোগ করেছেন।

যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রতিনিধি সভার আয়োজক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক মিখা পেরেগু। তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং সংগঠনকে সঠিক লাইনে নিতেই সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছে।’ তার দাবি, ‘কাউন্সিলে অনিয়ম হয়েছে, যা মেনে নেওয়ার মতো নয়। ওই সম্মেলনে একাধিক গঠনতান্ত্রিক ব্যত্যয় ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চা বিনষ্ট করা হয়েছে। তাই রিকুইজিশন সম্মেলনের ডাক দিয়েছি। বেশিরভাগ কাউন্সিলরই আমাদের পক্ষে রয়েছেন।’

একই প্রশ্নের জবাবে বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় কোনো মন্তব‌্য করবেন না জানিয়ে ফোন কেটে দেন।

এই বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘ছাত্র ইউনিয়নের মাদক বিরোধী অবস্থান দৃঢ়। এমন কোনো অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

১৯ জানুয়ারি আসতে পারে ঐক্যের ঘোষণা
ছাত্র ইউনিয়নের চলমান সংকট নিরসনে আগামী ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয় এলাকায় ‘মুক্তিভবনে’ সংগঠনের সদস‌্যদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছে সিপিবি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্র ইউনিয়নের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, ‘ওই বৈঠকে ঐক্য কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’ ছাত্র ইউনিয়নের এই শীর্ষ নেতার দাবি, ‘অনেকেই ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন। তার প্রভাব পড়েছে ছাত্র ইউনিয়নে।’

ওই নেতার দাবি, ছাত্র ইউনিয়ন স্বাধীন গণসংগঠন হলেও তার নীতি নির্ধারণী বিষয়গুলো ঠিক করে দেয় সিপিবি। ছাত্র ইউনিয়নের মধ্য থাকা পার্টির নেতা-কর্মীরা পার্টির নির্দেশনা অনুসারে দলকে পরিচালনা করেন। তবে, পার্টির সদস‌্য নন, এমন সদস্যরা সিপিবির নির্দেশনার প্রতি দায়বদ্ধ না থাকলেও সমস্যা হয় না।

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘প্রতি সম্মেলনেই কমিটি নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ থাকে। এবারও হয়তো আছে। শিগগিরই আলোচনার মাধ্যমে এটা সম্ভব হবে।’

তবে, অনিক-জয় অংশের নেতা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মিখা পিরেগু বলেন, ‘ঐক্যের চেষ্টাতেই তাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছি। তবে তারা সেই আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় প্রতিনিধিরাই নতুন সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

১৯ জানুয়ারির বৈঠকে ঐক্য হবে কি না, এমন প্রশ্নে পিরেগু বলেন, ‘আমরা সম্মেলনের সিদ্ধান্তে অনড়।’এদিনের বৈঠকে যেই সিদ্ধান্তই হোক, সম্মেলন হবে বলেও তিনি জানান।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী
শিরোনামঃ