Home > রাজনীতি > নিজেকে ‘সাচ্চা মুসলমান’ দাবি লতিফের

নিজেকে ‘সাচ্চা মুসলমান’ দাবি লতিফের

ঢাকা: মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন, দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। জেল খেটেছেন, সংসদ সদস্য পদও যায় যায় অবস্থা আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর।

নিউ ইয়র্কের এক অনুষ্ঠানে ইসলাম, হজ, মহানবী (সা.) ও তাবলিগ জামাতকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে তার এই অবস্থা।

এর ওপর হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ‘নাস্তিক’ আখ্যাও ইতোমধ্যে জুটে গেছে লতিফ সিদ্দিকীর। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পর্যন্ত তাকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে ফাঁসি দাবি করেছেন একাধিকবার। নিজের দলের ভেতর থেকেও উঠেছে একই ধরনের দাবি।

এতদিন তিনি নিজেও নিউ ইয়র্কে করা মন্তব্যের পক্ষে সাফাই গাইতেন। বলতেন, ‘ওই অনুষ্ঠানে যা বলেছি, জেনেশুনে এবং বিশ্বাস থেকে বলেছি। এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার। বক্তব্য নিয়ে অনুতাপ করার কিছু নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে আমি আমার এই বক্তব্য প্রত্যাহার করব।’

কিন্তু রবিবার সংসদ সদস্য পদ বাতিলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) শুনানিতে অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে ‘সাচ্চা মুসলমান’ দাবি করলেন লতিফ সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন সাচ্চা মুসলমান। ঈমানের সঠিক পথেই রয়েছি। ধর্ম নিয়ে সৃষ্ট ইস্যুতে কতিপয় গোষ্ঠীকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে।’

এ সময় লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমার দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে সংসদ সদস্য পদ থেকে আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘ইসির শুনানিতেও আমি একই কথা বলেছি। আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করব। স্পিকারকে শিগগিরই পদত্যাগপত্র দিব। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে গেলাম। এ নিয়ে আর শুনানি করার দরকার নেই।’

এরপর ইসির আদালত তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল বিষয়ে শুনানি দুই সপ্তাহের জন্য মুলতবি ঘোষণা করে। দুই সপ্তাহ পরেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এই শুনানিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সকালে লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ বাতিল বিষয়ে আপিল বিভাগ ‘নো অর্ডার’ দেয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কমুার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ লতিফ সিদ্দিকীর আবেদন শুনে এই ‘নো অর্ডার’ দেয়।

ফলে এ বিষয়ে লতিফের রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া হাইকোর্টের আদেশই বহাল থাকে এবং আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত এই নেতা এরপর ইসির শুনানিতে অংশ নেন।

গত ১৩ জুলাই সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে লেখা চিঠিতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ থাকা না থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত চান।

এরপর লতিফ সিদ্দিকী তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা না থাকা নিয়ে শুনানি করতে ইসির এখতিয়ার নেই এমন দাবি করে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিট খারিজ হলে তিনি চেম্বার জজ আদালতে যান। চেম্বার জজ বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগে পাঠান, যেখানে আজ হাইকোর্টের আদেশই বহাল থাকল।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সফরকালে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে টাঙ্গাইল সমিতির এক মতবিনিময় সভায় লতিফ সিদ্দিকী ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ সম্পর্কে কটূক্তি করেন।

সে সময়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী তাবলিগ জামাত সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র ছেলে ও তার প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কেও এক হাত নেন।

কমে ছাড়েনি সাংবাদিকদেরও। টকশোর অংশগ্রহণকারী থেকে এই পেশার লোকদের সরকারের এই প্রবীণ মন্ত্রী চুতমারানিসহ অশ্রাব্য সব গালাগাল করেন।

পবিত্র হজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী। আমি জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী। তবে তার চেয়েও হজ ও তাবলিগ জামাতের বেশি বিরোধী।’

বিরোধিতার কারণ ব্যাখ্যায় লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘এই হজে যে কত ম্যানপাওয়ার নষ্ট হয়। হজের জন্য ২০ লাখ লোক আজ সৌদি আরবে গিয়েছে। এদের কোনো কাম নাই। এদের কোনো প্রডাকশন নাই। শুধু রিডাকশন দিচ্ছে। শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা দিয়ে আসছে।’

তিনি বলেন, ‘এভারেজে যদি বাংলাদেশ থেকে এক লাখ লোক হজে যায় প্রত্যেকের পাঁচ লাখ টাকা করে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়।’

হজের উৎপত্তি সংক্রান্ত বর্ণনায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ (নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাহু আলাইহিস সালাম) চিন্তা করল এ জাজিরাতুল আরবের লোকেরা কিভাবে চলবে। তারাতো ছিল ডাকাত। তখন একটা ব্যবস্থা করলো যে, আমার অনুসারিরা প্রতিবছর একবার একসঙ্গে মিলিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটা আয়-ইনকামের ব্যবস্থা হবে।’

মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত তাবলিগ জামাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তাবলিগ জামাত প্রতি বছর ২০ লাখ লোকের জমায়েত করে। নিজেদের তো কোনো কাজ নেই। সারা দেশের গাড়িঘোড়া তারা বন্ধ করে দেয়।’

লতিফ সিদ্দিকী তার বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে বলেন, ‘কথায় কথায় আপনারা (প্রবাসী বাংলাদেশি) জয়কে টানেন কেন? জয় ভাই, সে কে? জয় বাংলাদেশ সরকারের কেউ নয়। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ারও কেউ নন। শুধু পরামর্শ দিতে পারে, কোনো কিছু বাস্তবায়নের ক্ষমতা তার নেই।’

টকশোতে যারা অংশ নেন তাদের ‘চুতমারানি ভাই’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা টক শোতে যায়, তারা টক-ম্যান। নিজেদের কোনো কাজ না থাকায় ক্যামেরার সামনে যেয়ে তারা বিড়বিড় করে। চু… ভাইদের আর কোনো কাজ নেই।’

প্রভাবশালী এই নেতা জানান, ‘আমি যাদের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে ১ লাখ পেয়েছি, তাদের কোনো তদবির এখন রক্ষা করি না।’

লতিফ সিদ্দিকীর এই বক্তব্যে দেশে-বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য অর্ধশতাধিক মামলা হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

চাপের মুখে সরকার লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। পরে আওয়ামী লীগ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়।

এরই মধ্যে পরোয়ানা মাথায় নিয়ে গত বছরের ২৩ নভেম্বর রাতে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নাটকীয়ভাবে কলকাতা থেকে বিমানে ঢাকায় ফেরেন। একদিন আত্মগোপনে থেকে ধানমন্ডি থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

পরে দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানো হয়। সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী
শিরোনামঃ