Home > অন্যান্য > মমতার দৃষ্টি পড়ুক তাদের ওপর

মমতার দৃষ্টি পড়ুক তাদের ওপর

যে নারী একদিন পরম মমতায় সন্তানদের লালন-পালন করেছেন বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনিই হয়ে পড়েন অসহায়। তখন প্রয়োজন হয় তাকে যত্নে রাখার। কিন্তু বর্তমানে বদলে যাওয়া এ সময়ে অনেক সন্তানই তাদের মাকে দেখেন না বা দেখার সময় করে উঠতে পারেন না। ফলে অনেক প্রবীণ নারীই হয়ে পড়েন অসহায়।এসব নিয়ে লেখাটি তৈরি করেছেন বদরুননেসা নিপা

আমাদের দেশে মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে মানুষ করেন নিজেদের উজাড় করে। নিজেদের জন্য কিছুই রাখেন না। স্বপ্ন দেখেন ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলে তারাই হবে তাদের বৃদ্ধ বয়সের আশ্রয়। কিন্তু সেটা কি সব সময় ঠিকঠাক হয়ে বর্তমানে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ছোট পরিবারে ঠাঁই পায় না বৃদ্ধ বাবা-মা। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ হয়ে যায় অসহায়। দেহের রক্ত মাংসের গাঁথুনি দুর্বল হয়ে যায়। এ সময় মানুষের প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, যত্নআত্তি সর্বোপরি মানবিক সহযোগিতা। বয়স বাড়ার কারণে একাকিত্ব ও পরিবার পরিজনের অবহেলা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যন্ত করে তোলে। দৈহিক রোগের পাশাপাশি মানসিক রোগের মাত্রা যোগ হয়। যা কখনোই কাম্য নয়।
মালীহা খানমের জীবনটা নুয়ে পড়া গাছের মতো। যার শেকড় আছে অথচ দুর্বল শাখা-প্রশাখার জন্য শক্ত হয়ে বাড়তে পারে না। দুর্বল দেহের জন্য সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, বাঁকা হয়ে গেছে মেরুদণ্ডের হাড়, একাকিত্বের বোঝা তার দুই কাঁধে। প্রতি মুহূর্তে প্রতীক্ষা করেন- এই বুঝি মৃত্যু কড়া নাড়ল জীবনের দুয়ারে। বিশাল বাড়িতে জীবনের সব আয়োজন নিথর হয়ে গেছে মানুষের অভাবে। স্বামী মারা গেছেন ৩০ বছর আগে। ছেলেমেয়েরা বিদেশে গড়েছেন ঘরবসতি। মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার কারণে পরবাসের বাসিন্দা হননি তিনি। বাড়িভাড়া আর ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে ভালোভাবেই কেটে যায় তার দিন, সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল নন। মাঝবয়সী পুরনো কাজের বুয়া আর ভাড়াটিয়ারাই তার সঙ্গী। জীবন ধারণের জন্য তাকে কষ্ট পেতে হয় না। তারপরও এই বয়সে একা থাকা কষ্টকর।
মিরপুর নিবাসী রোকসানা রহমান- তার দিন কাটে বই পড়ে। দুই মেয়ে নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। রোকসানা বেগম কলেজের প্রফেসর ছিলেন। নিজেই সক্ষম নিজের ব্যয়ভার বহন করতে। এ জন্য তাকে সন্তানের ওপর নির্ভর করতে হয় না। হতাশার স্বরে বলেন, সারাক্ষণ আমার মন খারাপ লাগে। খুব ইচ্ছে করে আমার নাতি-নাতনীদের সাথে থাকতে। বই পড়তে, রান্না করতে আর ভালো লাগে না। কিন্তু মেয়ের বাসায় তো আর থাকা যায় না। জীবনের শেষ দিনগুলো মেয়েদের সাথে থাকতে ইচ্ছে করে। লোকচক্ষুর ভয় আর সামাজিক রীতির জন্য থাকতে পারেন না মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে। মেয়েরা অস্বস্তি বোধ করে শ্বশুড়বাড়ির লোকদের সাথে মাকে রাখতে। তাই অব্যক্ত যন্ত্রণাগুলো ঝরতে থাকে নীরবে অশ্রু হয়ে।
কিন্তু আমাদের দেশের বেশির ভাগ প্রবীণ নারীই বৃদ্ধ বয়সে আর্থিকভাবে সক্ষম থাকেন না। তাদের জীবন ধারণের জন্য নির্ভর করতে হয় সন্তানদের ওপর। সন্তানেরা মায়ের ব্যয়ভার বহন করেন, খুশি হয়ে নয় বাধ্য হয়ে। এর প্রভাবও পড়ে তাদের আচরণে। যাদের জন্য সারাজীবন করেছেন তারাই ব্যস্ত তাদের জীবন নিয়ে। ব্যস্ততার অজুহাতে কেউই প্রবীণদের সময় দিতে চায় না। দরিদ্র পরিবারের প্রবীণদের অবস্থা আরো করুণ। সেখানে সন্তানেরা জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট আয় করতে পারে না। তাই মায়ের ব্যয়ভার বহন করতে চায় না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। বেশির ভাগ মানুষই সব কিছু দিয়ে তাদের সন্তানদের মানুষ করেন। শেষ বয়সে যখন তাদের শক্তি-সামর্থ্য, অর্থ থাকে না, তখন সন্তানও দূরে সরে যায়। তখন তাদের পড়তে হয় চরম দুরবস্থায়।
হামিদা বানু স্বামীহীন এক সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামে করেছেন যৌবনকাল। ছেলেকে পড়াশোনা করাতেই গ্রামের জমিজমা সব বিক্রি করেছেন। নাতিপুতি নিয়ে শেষ জীবনটা সুখে শান্তিতেই কাটবে। কিন্তু স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। রোড অ্যাক্সিডেন্টে ছেলেটা মারা গেল। প্রথম কয়েক দিন আত্মীয়স্বজন খোঁজখবর নিত। সবাই নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। ধীরে ধীরে সবার আসা-খাওয়া কমে গেল। বয়সের চেয়েও মানসিক কষ্টে অসুস্থ থাকতেন। ছেলের বন্ধুরা একদিন রেখে যান বৃদ্ধনিবাসে। মাঝে মধ্যে তারা খবর নেন। ঈদে কাপড় আনেন। এখন এই বৃদ্ধ আশ্রমই তার শেষ এবং একমাত্র ঠিকানা।
এসব প্রবীণ, যারা এক সময় এ সমাজের জন্য কাজ করেছে, তাদের জন্যও সমাজ-রাষ্ট্রের করণীয় আছে। তাদের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তারা সমাজের বোঝা নয়, একজন প্রবীণ নাগরিক হিসেবে তাদের গণ্য করতে হবে। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সেবায় এগিয়ে আসতে হবে। বৃদ্ধভাতা, চিকিসা নিশ্চিত করতে হবে সবার জন্য। প্রবীণেরা শুধু দায়িত্ব পালনই আশা করেন না, মর্যাদার সাথে বাঁচতে চান তারা। এটা তাদের প্রাপ্য। কিন্তু কতজন এ মর্যাদাটুকু পান। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রবীণদের আত্মনির্ভরশীল করতে হবে। পিতা-মাতার দায়িত্ব নিতে সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আগামী প্রজন্মের মধ্যেও বাড়াতে হবে পরিবারের প্রতি আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ।

সূত্র :- নয়াদিগন্ত।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী
শিরোনামঃ