Home > অন্যান্য > ফিচার > জীবন যুদ্ধে আন্না রাণী’র পথ চলা ….

জীবন যুদ্ধে আন্না রাণী’র পথ চলা ….

শিল্পী রাণী হালদার: “মাঝ দরিয়ায় ঝড় উঠেছে/ উথাল পাতাল নদী ভিড়বে তবু জীবন তরী/ স্বপ্ন থাকে যদি।” হ্যাঁ, কবির এ কথাগুলো খুব বেশি মিলে যায় জীবন যুদ্ধে টিকে থাকা সংগ্রামী এক নারীর সাথে। যিনি অভাবের সংসারে স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েছেন। জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে আসা সত্ত্বেও যিনি আশা ছাড়েননি, ভেঙে পড়েননি। বটবৃক্ষ হয়ে ছাঁয়া বিলিয়ে যাচ্ছেন নীরবে-নিভৃতে। বলছিলাম এমন একজন নারীর কথা যিনি জীবনের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছেন নিরন্তর। তিনি আর কেউ নন আড়ানী কলেজ পাড়া গ্রামের আন্না দাস।

আন্না দাস। জন্ম ১৯৮১ সাল। অভাব অনটন লেগে থাকা ১টি পরিবারে যার বেড়ে ওঠা। তাই ভাগ্যে পড়ালেখা খুব একটা জোটেনি। আড়নীর তুষার দাসের সাথে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। নতুন সংসারে এসে ভালোই দিন কাটছিল তাঁর। কিন্তু হঠাৎ করে তার স্বামীর আগের বউ চলে আসায় তিনি পড়েন বিপাকে। সেখানে অনেক কষ্ট করতে হয় তাকে।
বিয়ের ২ বছর পর বড় ছেলে বিশ^জিত’র (২১) জন্ম।

আর সেই ছেলে জন্ম হয় প্রতিবন্ধি হয়ে। ঠিক তার ৫ বছর পরে আরেকটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন তিনি। নাম তার বাঁধন (১৫)। ছোট ছেলের জন্মের পর তিনি ভেবে ছিলেন সংসারে একটু শান্তি আসবে কিন্তু প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখে পড়তে হয় আন্না দাসকে। তবু তিনি থেমে থাকেননি। নানা মানসিক নির্যাতনের মধ্যেও প্রতিবন্ধি সন্তানকে নিয়ে একাই লড়ে গেছেন।

আন্না দাসের স্বামীর ছোট্ট একটা আয়রনের দোকান ছিল বাজারে। সেখান থেকে যে টাকা আসতো তা দিয়েই চলে যেত সংসার। তাঁর স্বামী প্রথম স্ট্রোক করেন ২০১৩ সালে। ঠিক তার এক বছর পরে হঠাৎ করেই মারা যায় আন্না দাসের স্বামী। এমতাবস্তায় প্রচন্ড ভাবে ভেঙ্গে পড়েন তিনি। বড় ছেলে প্রতিবন্ধী হওয়ায় তেমন কিছু করতে পারতো না সে। তাই দোকানটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। ছেলেদের নিয়ে বাড়িতে বসেই তিনি কাজ শুরু করেন। বড় ছেলের মাধ্যমে কাজগুলো দোকানে নিয়ে কাস্টমারদের পৌছে দিতেন। এভাবেই চলতে লাগলো
আন্না দাসের জীবন। কিন্তু আবারো আন্না দাসের জীবনে ঘটে যায় বড় একটি দূর্ঘটনা। স্বামী হারানোর শোক সামলাতে না সামলাতে হঠাৎ করে তাঁর বড় ছেলে মারা যায়। স্বামী আর সন্তানকে হারিয়ে তিনি দিশে হারা হয়ে পড়েন। জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।

প্রতিবেশী আর আত্মীয় স্বজনরা তাকে সাহায্য-সহযোগীতা করেন। কিন্তু এইভাবে আর কতদিন? তাই সব দুঃখ কষ্টকে নিজের মধ্যে চেপে রেখে শুধু ছোট ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামীর ব্যবসাটা সামনে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। শুরুর দিকে অনেক কটু কথা শুনতে হয় তাঁকে। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। সব প্রতিকুলতাকে জয় করে কাজ শুরু করেন নতুন উদ্যমে।

সমস্ত বাঁধাকে পেছনে ফেলে সাহস করে এগিয়ে গেছেন তিনি। মনের জোর আর ইচ্ছা শক্তি থাকলে সব কিছুকে জয় করা সম্ভব। এমনটাই করে দেখিয়েছেন আন্না রাণী দাস। তিনি এখন অন্যের কাছে হাত পেতে নয় বরং তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ দিয়েই নিজের সংসার চালাচ্ছেন। আন্না রাণী আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিক্ষার প্রতি অদম্য স্পৃহার কারণেই তিনি শত কষ্টের মাঝেও ছেলেকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। এরকম দৃঢ় মনোবল নিয়ে প্রতিটি নারী সামনে এগিয়ে যাক। আন্না রাণী’র মতো আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীর মনেও ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করার মানসিকতা জাগ্রত হোক।

লেখক: শিল্পী রাণী হালদার, কমিউনিটি মিডিয়া ফেলো, রেডিও বড়াল, বাঘা।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ