Home > জাতীয় > রাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু : পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ড

রাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু : পুলিশের ধারণা হত্যাকাণ্ড

রা.বি. প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের ডাইনিংসংলগ্ন ড্রেন থেকে এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সুরতহাল পর্যবেক্ষণ করে পুলিশ হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছেন। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছেনা পুলিশ।

নিহত মোতালেব হোসেন লিপু গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন। তিনি নবাব আব্দুল লতিফ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং ২৫৩ নম্বর রুমে থাকতেন। তিনি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড থানার মুকিমপুর গ্রামের বদরউদ্দিনের ছেলে।

গতকাল সন্ধ্যায় লিপুর চাচা বশির উদ্দিন অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে নগরীর মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লিপুর রুমমেট মনিরুল ইসলাম, বন্ধু প্রদীপসহ হলের দুই কর্মচারীকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এদিকে বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ডা. এনামুল হক বলেন, ‘নিহতের মাথার ডান পাশে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন আছে। এতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বুকের দুই পাশে দুটি হাড় ভেঙে গেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মজিবুল হক আজাদ খান জানান, লতিফ হলের ডাইনিংয়ের এক কর্মচারী সকালে ঝাড়ু দিতে গিয়ে ডাইনিংয়ের পাশে ওই শিক্ষার্থীর লাশ দেখতে পান। পরে খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য, হল প্রশাসন ও পুলিশ এসে তাঁর লাশ উদ্ধার করে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। আগামী ২ নভেম্বর থেকে দ্বিতীয় বর্েষর চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তাঁর।

গতকাল সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, তিনতলা ওই হলের পূর্ব-দক্ষিণ অংশে ভবনের হাতদুয়েক দূরের ড্রেনে বাঁ দিক হয়ে মরদেহ পড়ে আছে। প্রায় এক হাতের ওই ড্রেনে মরদেহের পুরো অংশ পড়ে ছিল। পরনের লুঙ্গি অনেকটা অনাবৃত ছিল। পায়ে কোনো স্যান্ডেল জুতা ছিল না। সেখানকার উত্তর পাশে হলের ডাইনিং অংশ। আর পূর্ব-দক্ষিণ অংশে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তার ওপরে তারকাঁটার বেড়া। দক্ষিণের ওই অংশে কাঠের একটি দরজা তালাবদ্ধ। এ দরজাটি দিয়ে ডাইনিংয়ের খাবারের উপাদান ও খড়ি আনার কাজে ব্যবহার করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ‘হলের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে বা ফেলে দিলে তির্যকভাবে ঠিক সরু ড্রেনের মধ্যে পড়ার কথা নয়। অন্তত কয়েক ডিগ্রি কৌণিকভাবে এবড়োথেবড়োভাবে পড়ার কথা। কিন্তু লিপুর লাশ মাত্র এক হাতের ওই ড্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হল-সংলগ্ন পূর্ব দিকের মাঠ বা অন্য কোনো স্থানে তাঁকে হত্যা করে এখানে ফেলা হতে পারে। আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য কৌশল হিসেবে ঘাতকরা লাশ ফেলে যেতে পারে।

তাছাড়া লাশের মাথা বাম দিকে কাত হয়ে ড্রেনের মধ্যে পড়েছিল। তবে ময়নাতদন্ত শেষে বেলা তিনটার দিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ডা. এনামুল হক জানান, লিপুর মাথায় ডান পাশে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন আছে। যার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। আর বুকের দু’পাশে দুটো হাড় ভেঙে গেছে। শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, পূর্ব দিকের ওই মাঠ থেকে একটি স্যান্ডেল, দুটি ইট ও লিপুর কক্ষ থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। তবে নগরীর মতিহার থানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত ছাড়া সে সম্পর্কে বলতে পারছি না।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার আমীর জাফর বলেন, ‘এটি হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তদন্ত না করে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’

ঘটনাস্থলের পাশের কক্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, রাত ৩টার দিকে তাঁরা কিছু একটা পড়ার শব্দ পেয়েছিলেন। তবে পরক্ষণেই আর সাড়াশব্দ না পেয়ে তাঁরা ঘুমিয়ে যান। পরে সকালে হল কর্মচারীর মুখে লাশের খবর পান।

লিপুর রুমমেট ও এ ঘটনায় আটক উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, রাত ১০টার দিকে লিপু ভাই মাদার বক্স হলে যায়। আমি ওই সময় তাকে একবার ফোন দিয়েছিলাম। তিনি পরে রুমে আসবেন বলে আমাকে জানান। পরে রুমে এসে রাত ১২টার দিকে ঘুমাবেন জানিয়ে আমাকে লাইট বন্ধ করতে বলেন। আমি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে কিছুক্ষণ পড়ার পর ঘুমিয়ে পড়ি। পরে সম্ভবত রাত ৪টার দিকে একবার দরজা খোলার শব্দ শুনি। তখন ভাবলাম তিনি হাঁটতে বের হচ্ছেন। আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে দেখি তিনি রুমে নাই, পরে আমি ক্লাসে চলে যাই। ক্লাসে থাকা অবস্থায় শুনি তিনি মারা গেছেন। আমি আর কিছু জানি না।

লিপুর সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লিপু কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে অর্থনৈতিক সংকটজনিত মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকতেন। বছরখানেক আগে একটি নিয়োগের পরীক্ষায় বদলি পরীক্ষা দিতে গিয়ে তিন মাস জেল খাটেন তিনি। পরে জামিনে মুক্ত হন। এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে।

একই প্রসঙ্গে লিপুর চাচা বশির উদ্দিন বলেন, ‘গত মঙ্গলবার লিপু বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। কারো সঙ্গে ঝামেলায় না জড়িয়ে পড়াশোনা করতে বলি। এর আগে বদলি পরীক্ষা দিয়ে ধরা পড়ার পর কয়েকজন লিপুকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে আসছিল।’

গতকাল দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থলের আলামত দেখে নগর পুলিশের উপকমিশনার (পূর্ব) আমীর জাফর বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি এটি হত্যাকাণ্ড। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।’

তদন্তের দাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের : লিপুর মৃত্যুর ঘটনার রহস্য উন্মোচনে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিভাগের সভাপতি প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, ‘ময়নাতদন্তে মোতালেবের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’ পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্রলীগ লিপুর মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।

ক্যাম্পাসে জানাজা : ময়নাতদন্ত শেষে বিকেল ৫টায় ক্যাম্পাসে লিপুর মরদেহ নেওয়া হয়। বিকেল সোয়া ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপ-উপাচার্য চৌধুরী সারওয়ার জাহান, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক মিজানুর রহমানসহ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিল। পরে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার মকিমপুরের উদ্দেশে লাশবহনকারী গাড়ি রওনা হয়।

রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি পরিবারের : লিপুর মৃত্যুর খবরে পরিবারসহ সারা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। মকিমপুর গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তাঁর এই মৃত্যুর খবর কেউই মেনে নিতে পারছে না। লিপুর মা হোসনেয়ারা আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার লিপু পূজার ছুটি কাটিয়ে গত মঙ্গলবার বাড়ি থেকে চার হাজার টাকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে ফরম ফিলাপ করার কথা বলে। আমার সব শেষ হয়ে গেল।’ তিনি বলেন, ‘অভাবের সংসার, এর পরও অনেক কষ্ট করে ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছি। আশা ছিল ছেলে বড় সাংবাদিক হবে। সে আশা পূরণ হলো না।’

বোন লিমা বলেন, ‘আমার ভাই আমাকে ঢাকায় পড়াতে চেয়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন। সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমাদের কে দেখবে?

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ