Home > জাতীয় > সংলাপ ছাড়াই বিধি সংশোধন

সংলাপ ছাড়াই বিধি সংশোধন

নিউজডেক্স জনতারবাণী: দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধি সংশোধনে রাজনৈতিক দল, পর্যবেক্ষক সংস্থা ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপে বসবে না নির্বাচন কমিশন। নতুন করে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপও নেবে না। পৌর নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার অজুহাতে কমিশন বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূল নেতারাও যাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার ক্ষমতা পায় কমিশন সে সুযোগ তৈরি করছে। নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত বিধি সংশোধন করে এ ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে দুটি বিধিমালার কমপক্ষে ২০টি ধারা সংশোধনের কাজ শুরু করেছে।

নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। আইন পাশ হয়ে যাচ্ছে, এটা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা সেই আইনের আলোকেই বিধিমালা সংশোধন করব।’ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধির আলোকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের চিন্তা করছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয়ভাবে হয়। এখন থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয়ভাবে হবে।’ তিনি বলেন, ‘তাড়াতাড়ি বিধিমালা সংশোধন করতে হবে। কারণ ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচন। নভেম্বরে তফসিল দিতে হবে। এর আগেই শেষ করতে হবে সংশোধনীসংক্রান্ত কাজ।’

 কোনো দলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন বিধিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রেও কারও সঙ্গে আলোচনা করছে না বলে জানা গেছে। এর আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন নিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশন সংলাপের আয়োজন করে। এতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অথচ কমিশন এবার সংলাপের আয়োজন না করে নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দল শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা। এখন থেকে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সব নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে। কাজেই সংসদ নির্বাচনের জন্য নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুযোগ পাবে কিনা তা স্পষ্ট করতে হবে কমিশনকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন টেলিফোনে বলেন, ‘ছোট-বড় সব দলের প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বড় দলগুলোর কাছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কুক্ষিগত হয়ে না পড়ে সে জন্যই এ পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে তৃণমূল পর্যায়ের ছোট রাজনৈতিক দলগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।’

 সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিধিমালা সংশোধনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কার্যক্রম, প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বিধান, প্রচার-প্রচারণা, প্রতীক বরাদ্দ, প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ, নির্বাচনী ব্যয় ও উৎসের বিবরণী, ব্যালট পেপারে পরিবর্তন, প্রার্থী বাছাই, চূড়ান্তকরণ ও ফল ঘোষণার প্রক্রিয়াসহ আরও বেশকিছু ধারায় নতুন বিধান যুক্ত হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে পৌরসভা নির্বাচনের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় এ সংক্রান্ত বিধিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশোধনের প্রস্তুতি চলছে।

ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিবকে প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর দিতে হবে। তাদের স্বাক্ষরই প্রমাণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দলীয় প্রার্থী। বিপুলসংখ্যক প্রার্থী চূড়ান্ত করা কেন্দ্রের জন্য কষ্টসাধ্য কাজ। এ বিবেচনায় প্রার্থী মনোনীত করার ক্ষমতা কেন্দ্রের পাশাপাশি তৃণমূলের কমিটিকেও দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি তৃণমূলকে এ সংক্রান্ত ক্ষমতা দিলেই শুধু তা নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করবে। এ জন্য নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালায় প্রার্থী মনোনয়নকারী হিসেবে দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক/মহাসচিব বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত তৃণমূল কমিটির নেতার স্বাক্ষরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

 বিধিমালা সংশোধনীর খসড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা দেয়ার শর্ত শিথিল করার প্রস্তাবনা রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া আচরণবিধিতে মন্ত্রী, এমপি ও মেয়রদের প্রচারণায় বিধি-নিষেধ রাখার চিন্তাভাবনা করছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।
এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সংশোধিত স্থানীয় সরকার আইনের কপির জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। এটি হাতে পাওয়ার পর প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো শেষ করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংশোধিত আইন বা অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।

জানা গেছে, সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচনের সময় এগিয়ে এলেও বিধিমালাগুলো চূড়ান্ত না হওয়ায় মনোনয়নপত্রসহ নির্বাচনী ফরমগুলোর ছাপানোর কাজ শুরু হয়নি। প্রতিটি পদের জন্য আলাদা ব্যালট ছাপা হবে নাকি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মেয়র, সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে পৃথক ৩টি ব্যালট ছাপা হবে- তা নিয়েও এক প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন কমিশন কর্মকর্তারা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন ও বিধির আলোকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা তৈরির কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে ভারতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধি অনুসরণ করছেন তারা। এসব বিষয় ‘স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে কঠোর গোপনীয়তায় বিধি সংশোধনের কাজ করছেন কয়েকজন নির্বাচন কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন সংশোধনের অনুমোদন পাওয়ার পর এটি আগামী সপ্তাহে পৌরসভা নির্বাচনের আইনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির সম্ভাবনা আছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সংশোধিত আইনের ওই কপি পাওয়ার পরই শুধু কমিশন বিধিমালা সংশোধনে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করতে পারবে।

 এদিকে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় সরকারেও দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের তালিকা দেয়ার বিধান রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে কমিশনে এক প্রকার দ্বন্দ্ব চলছে। একজন নির্বাচন কমিশনার এ বিধান স্থানীয় নির্বাচনেও রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। অপর একজন কমিশনার এক শতাংশ থেকে কমিয়ে নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর রাখার পক্ষে রয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে কমিশনে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। তবে ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে অনেক পদ হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারে লাখের বেশি। তাদের সমর্থনসূচক তালিকা যাচাই করা হবে খুবই কঠিন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণায় বাধা থাকছে : দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও প্রচারণার ক্ষেত্রে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ সরকারি সুবিধাভোগীদের প্রচারণার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করার পক্ষে আলোচনা চলছে ইসিতে। তাদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলোকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে ইসি। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রচারণায় অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিষয়টি যুক্ত করার পক্ষে কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। তবে সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা সব ধরনের সুবিধা ছেড়ে শুধু নির্বাচনী এলাকার ভোটার হলে ভোট দিতে যেতে পারবেন।

নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, সংসদের আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখেই আচরণবিধি করতে হবে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রধানের ছবি, দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুবিধাভোগী ব্যক্তির তালিকা নির্ধারিত করে বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে।

প্রতীক নির্ধারণ : দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্বাচনী বিধিমালায় প্রত্যেক দলের বিপরীতে বরাদ্দকৃত প্রতীক উল্লেখ করা হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনের জন্য বরাদ্দকৃত প্রতীকগুলোকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রত্যেক নির্বাচনে এ বিধান যুক্ত হতে যাচ্ছে বলেও জানান তারা।

ইউপি নির্বাচনে হলফনামা দেয়ার বিধান : দেশে প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হলফনামা দেয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। জাতীয় সংসদ, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে এ বিধান থাকলেও ইউপিতে তা ছিল না। দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধান প্রবর্তনের কারণে হলফনামা দেয়ার বাধ্যবাধকতা যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী
শিরোনামঃ