Home > জাতীয় > শিক্ষকতা থেকে যেভাবে রাজনীতিতে পরশ

শিক্ষকতা থেকে যেভাবে রাজনীতিতে পরশ

রাজনীতির কাছে থেকেও রাজনীতি থেকে দূরে থাকা শেখ ফজলে শামস পরশ অবেশেষে রাজনীতিতে আসলেন। এমন সময়ে তিনি যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন, যখন তার বাবা শেখ ফজলুল হক মনির প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজনীতিবিমুখ পরশের শিক্ষকতা পেশা থেকে রাজনীতিতে আসাকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার চমক বলে আখ‌্যায়িত করছেন নেতাকর্মীরা।

শেখ ফজলে শামস পরশ যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে। ছোট ভাই শেখ ফজলে নূর তাপস অনেক আগেই রাজনীতিতে নাম লেখালেও পরশ সব সময়ই রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল না তার।

কেন রাজনীতিতে এতদিন আসেননি, সে বিষয়ে পরশ বলেছেন, ‘ছোটবেলায় রাজনীতি আমার এবং আমার ভাই শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছ থেকে অনেক কিছু… বলতে গেলে সবকিছুই কেড়ে নিয়েছে। আমরা ছোটবেলায় হারিয়েছি আমার মা-বাবাসহ অন্যান্য স্বজন। আমাদের দুঃখ শুধু বঙ্গবন্ধুর কন্যাদ্বয় শেখ রেহানা এবং প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা অনুধাবন করতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যে জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাকে যখন এত নির্মমভাবে ষড়যন্ত্রকারীরা হত্যা করতে পারল, আশাহত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ এবং তার কন্যার দেশের প্রতি উদার ভালবাসা থেকে আমি সাহস পাই।”

সম্প্রতি জুয়া-ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে যুবলীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতার তথ‌্য উদঘাটিত হওয়ার পর সংগঠনটি ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে। ইতিবাচক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির ধারায় ফেরাতে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতা খুঁজছিল আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সে হিসেবে পরশকে বেছে নেয়া হয়েছে। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, পরশের নেতৃত্বে যুবলীগ তার অতীতের সুনাম ফিরিয়ে আনতে পারবে। একই সঙ্গে যুবলীগে সৎ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির সূচনা হবে।

শেখ ফজলে শামস পরশ যুবলী‌গের নেতৃত্বে আস‌ছেন, এটা আ‌গে থে‌কেই আ‌লোচনায় থাক‌লেও নেতাকর্মী‌দের কাছে বার্তা প‌রিষ্কার হ‌য়ে যায় যখন স‌ম্মেল‌নের এক ‌দিন আ‌গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সম্মেলনস্থলে আসেন তি‌নি। এরপর ওই দিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তার উপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের মধ্যে আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে তিনি যুবলীগের নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আস‌ছেন। শনিবারের সম্মেলনে ‌তি‌নি মঞ্চে উপস্থিত হলে চেয়ারম্যান পদে পরশের নাম ঘোষণা শুধু আনুষ্ঠানিকতার অ‌পেক্ষায় থা‌কে।

পরশের নাম ঘোষণার পর শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। তারা বলেছেন, শেখ পরিবারের নেতৃত্ব মানেই তাদের কাছে বিশেষ কিছু। একটি অনুভূতির নাম। এই পরিবার থেকে নেতৃত্ব থাকলে তারা বিশ্বাস করেন, ভালো কিছু হবে।

শেখ ফজলে শামস পরশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে ফের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১০ বছর ধরে তিনি রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

গত ৪৩ বছরে যুবলীগ বর্তমানে সবচেয়ে সংকটকাল পার করছে। দুর্নীতি, অনিয়ম আর ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে সংগঠনটির ওপর দিয়ে বড় ধরনের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এখন সংগঠনটিকে ঢেলে সাজানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে পরশের জন্য। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি কতটা প্রস্তুত সেটি সময় বলে দেবে। তবে তিনি জানিয়েছেন, দেশের রাজনীতি নিয়ে যুবসমাজের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা আছে, সেখান থেকে রাজনীতিকে ইতিবাচক ধারায় আনতে কাজ করবেন।

দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিত্ব হিসেবে বেশ আস্থাভাজন ছিলেন পরশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার রাতে শেখ ফজলে শামস পরশের বাবা-মা শহীদ হয়েছিলেন। পরশের ছোট ভাই ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা-১০ আসনের এমপি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসা ছাড়াও ঘাতকরা আক্রমণ করে আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ ফজলুল হক মনির ধানমন্ডির বাড়িতে। ঘাতকের বুলেটে মনি এবং তার স্ত্রী শেখ আরজু মনি নিহত হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তাদের দুই শিশুপুত্র পরশ ও তাপস। ১৯৭৫ সালে শেখ ফজলে শামস পরশের বয়স ছিল ৫ এবং শেখ ফজলে নূর তাপসের ৩ বছর। পরিণত বয়সে তাপস রাজনীতিতে পাকাপোক্ত অবস্থান করে নিলেও দূরে ছিলেন পরশ।

যুবলীগের সপ্তম কংগ্রেসের দ্বিতীয় পর্বে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে যুবলীগের নতুন এই চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পুরো হলরুম স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন নেতাকর্মীরা। এর আগে যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে পরশের নাম প্রস্তাব করেন যুবলীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম। এর বাইরে চেয়ারম্যান পদে আর কোনো নাম না আসায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ওই পদের দায়িত্ব পান শেখ ফজলে শামস পরশ।

এর আগে শনিবার বেলা ১১টা ৮ মিনিটে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে যুবলীগের কংগ্রেস উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ সময় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তিনি।

স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে যুবলীগ গঠন করেন তার ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি। ১৯৭৪ সালে যুবলীগের প্রথম কংগ্রেসে তিনিই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান শেখ মনি ও শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক। ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে তাকে সংগঠনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। একই সঙ্গে সম্মেলনের সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকেও দূরে রাখা হয়েছে।

১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির দ্বিতীয় জাতীয় কংগ্রেসে আমির হোসেন আমু চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোস্তফা মহসীন মন্টু। ১৯৯৩ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। ১৯৯৬ সালের চতুর্থ জাতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ২০০৩ সালের পঞ্চম জাতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর কবির নানক।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ