Home > জাতীয় > জামিন পেয়েই বাহিনী গড়ে নয়ন

জামিন পেয়েই বাহিনী গড়ে নয়ন

নয়ন বন্ডরা প্রকাশ্যেই অপরাধ করে বেড়াবে আর তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ বলি দেবে সাধারণ মানুষ, এ যেন মগের মুল্লুক! বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমনটাই হচ্ছে বলে দাবি মানবাধিকারকর্মী, সংস্থাসহ দেশের সাধারণ ও সচেতন মহলের।
অপরাধীদের বেপরোয়া হওয়ার নেপথ্যে জামিনের সহজলভ্যতাকেই দুষছেন মানবাধিকারকর্মীরা। মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য— অপরাধীরা জামিনের সহজলভ্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়েই হিংস্র থেকে হিংস্র হচ্ছে। যার ফলে ঘটছে বিশ্বজিৎ থেকে শুরু করে বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মতো বিভৎস ঘটনা।

এসবের কারণ ব্যাখায় তারা বলছেন— অপরাধীদের প্রথম অপরাধ সংঘঠনের পরই আইনের হাওলায় নেয়া হলেও মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ঘটনা সংশ্লিষ্ট যথাযথ তথ্য আদালতে উপস্থাপনে ব্যর্থতার কারণে সহসাই জামিন লাভ করছে অপরাধীরা। প্রথম জামিনই অপরাধীকে করে তোলে অধিক বেপরোয়া। মাঠপর্যায়ে পুলিশের এমন ভূমিকায় অপরাধ দমন তো দূরের কথা, বরং আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে অপরাধ।

চট্টগ্রামের ওআর নিজাম রোডে পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা বাবুলের স্ত্রীকে প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে খুনের ঘটনা থেকে শুরু করে বিশ্বজিৎ হয়ে আজ বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যকাণ্ড তারই বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেছেন মানবাধিকারকর্মীসহ অনেকেই।

তথ্য মতে, রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা নয়ন বন্ড, রিশান ফরাজী ও রিফাত ফরাজীসহ তাদের ‘বন্ড’ ও জিরো জিরো সেভেন সংকেত ব্যবহারকারী বন্ড বাহিনীও দীর্ঘদিন ধরেই মাদক-ছিনতাই-ইভটিজিংসহ নানা অপরাধের সংগঠক। ২০১৭ সালেও এ বাহিনীর সদস্য রিফাত ফরাজী কুপিয়ে গুরুতর আহত করে প্রতিবেশী আরেক যুবককে।

শুধু তাই নয়— এ বাহিনী সংশ্লিষ্ট এলাকার মেস-বাসাতেও প্রকাশ্যে দিবালোকে মালামাল ছিনতাই করে বৈকি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এ যেন দিন-দুপুরের ডাকাতি। বন্ড বাহিনীর প্রধান নয়ন বন্ড ২০১৭ সালেও মাদকের একটি বড় চালানসহ গ্রেপ্তার হলেও সে মামলায়ও জামিন পায় সহসাই। এতসব ঘটনায় আটক কিংবা গ্রেপ্তারের পরও আদালত থেকে জামিন লাভের পর আরও অধিক বেপরোয়া হয়ে তাণ্ডব চালায় সংশ্লিষ্ট এলাকায়।

তাণ্ডবে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর এসব ঘটনায় মুখ খুললেও অতীতে ঘুণাক্ষরেও মুখ খোলেননি এ বাহিনীর পেছনে রাঘববোয়ালদের সংশ্লিষ্টতার ভয়ে। তবে এতসব অভিযোগের পরও সহজেই অপরাধীরা জামিন লাভ করছে পুলিশের যথাযথ তথ্য উপস্থাপন ব্যর্থতার কারণে।

এমন প্রশ্নে পুলিশ সদর দপ্তর এ অভিযোগকে সঙ্গত নয় বলেই দাবি করেছে এবং এও বলছে— জামিন দেয়া না দেয়া একমাত্র আদালতের এখতিয়ার। মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণ ও সচেতন মহলও জামিন দেয়ার এখতিয়ার শুধুই আদালতের বলেন, তবে তারা এও বলছেন, মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা আদালতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ তথ্য উপস্থাপন না করাতেই জামিন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

সহজলভ্য জামিনের ফলেই আজ বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড। এর কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছেন, রিফাত শরীফ হত্যকাণ্ডের আগে ২০১৭ সালে মাদকের একটি বড় চালানসহ গ্রেপ্তারের পর আলোচনায় উঠে আসে ‘নয়ন’ নামটি। প্রথমে নিজের নামের সঙ্গে ‘বন্ড’ যোগ করেন তিনি গড়ে তোলেন ‘বন্ড বাহিনী’।

যার সেকেন্ড ইন কমান্ড রিশান ফরাজী ও তার ভাই রিফাত ফরাজি। দুই ভাইয়ের নেতৃত্বেই ঘটনার আগের রাতে নৃশংসভাবে রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা করে বন্ড বাহিনী। এ বাহিনীর সব অপকর্মের পরিকল্পনা ‘জিরো জিরো সেভেন’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমেই করত বলেও জানা গেছে।

২০১৭ সালে মাদকের চালানসহ গ্রেপ্তারের ঘটনায় পুলিশের নড়বড়ে ভূমিকায় জামিন পাওয়ায় অধিক সাহসী হয়ে উঠে নয়ন— এমনটি দাবি করে স্থানীয়রা বলেন, তৎকালীন ঘটনায় পুলিশ নয়ন বন্ডের লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হলেই আজ রিফাত শরীফ হত্যাসহ অন্যান্য ঘটনার জন্ম হতো না।

বন্ড বাহিনীর ডান ও বাম হাত রিশান ফরাজী ও রিফাত ফরাজী ছাড়াও এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য ছিল মুসা বন্ড, রাব্বি ও সিফাত বন্ডসহ আরও অনেকে। এদের প্রতেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছে পুলিশের কাছে বারবার। অথচ প্রতিবারই জামিনে মুক্তি পেয়ে তাদের তাণ্ডব আরো বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়দের একজন বলেন, এমন কোনো নেশা ছিল না, যা নয়ন বন্ডের কাছে ছিল না। ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন নিয়ে অনেকবার ধরাও পড়েছিল। মানুষকে হাইজ্যাক করত। মোবাইল ফোনে টাকা পয়সা নিত।

মেয়েদের উত্ত্যক্ত করত, এটাই ছিল মূলত নয়নসহ তার বন্ড বাহিনীর সদস্যদের পেশা। এদিকে রিফাতকে হত্যার ঘটনাটি ‘বন্ড বাহিনী’ একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে আগের রাতেই পরিকল্পনা অনুযায়ী চূড়ান্ত করে। গ্রুপের কথোপকথনে দেখা যায় ‘জিরো জিরো সেভেন’ সদস্যদের সবাইকে সকাল ৯টায় কলেজে আসার নির্দেশ দেয় রিফাত ফরাজী।

হত্যাকাণ্ডে কোপানোর জন্য প্রত্যেককে ধারালো অস্ত্র আনার জন্যও বলে সে। আর ঘাতক নয়নের সাথে নিহত রিফাতের স্ত্রীর একটি ছবি দিয়ে সবাইকে নয়ন ও মিন্নি সম্পর্কের কথা জানান দেয় তারা।

‘জিরো জিরো সেভেন’ গ্রুপ সম্পর্কে স্থানীয় একছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, আমাদের কলেজে নয়ন একটি আতঙ্কের নাম। এদের গ্রুপের প্রায় সবার নামের পেছনে বন্ড নামটা থাকত। রিফাতকে হত্যার প্রায় তিন ঘণ্টা আগেও ‘জিরো জিরো সেভেন’ গ্রুপে একটা পোস্ট হয়, যারা আমাদের গ্রুপে আছে তারা যেন অবশ্যই সকাল ৯টায় কলেজ গেটে দেখা করে। ওই ছাত্র আরও জানায়, রিফাতের এই ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। রিফাতকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফ কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গত বুধবার রাতে নিহতের বাবা বাদি হয়ে নয়ন ও রিশানসহ ১২ জনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা করেন। এরপরই গ্রেপ্তার করা হয় চন্দন, হাসান ও নামজুল নামের তিন আসামিকে।

মামলায় উল্লিখিত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও দুইদিন পরও মূল হোতা নয়ন বন্ডকে এখানো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ইতোমধ্যে নয়ন বন্ড ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে শঙ্কা।

তবে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে বরগুনা জেলা পুলিশ। এর আগে বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে এ ঘটনার সন্দেহভাজন চারজনকে আটকের পর ছেড়েও দেয়া হয়েছে। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। আসামিরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য স্থলবন্দর ও নৌবন্দরগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর এআইজি মো. সোহেল রানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এরই মধ্যে হতাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জড়িত অন্যদেরকে গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আসামিরা যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও নৌবন্দরগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে জেলা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই, সিআইডি, র‌্যাব এবং ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট কাজ করছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আসামিদের বিষয়ে তথ্য থাকলে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে ইতোমধ্যে ফুঁসে উঠেছে গোটা দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম সব জায়গাতেই বইছে নিন্দার ঝড়।

বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানান, মামলার প্রধান আসামিকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার দিন বুধবার মধ্যরাতে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় নিহত রিফাতের বাবা একটি হত্যা মামলা করেন। যদিও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি প্রধান আসামি নয়নসহ বাকি সাতজন।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ