গণমাধ্যমকে দুষলেন দুদক সচিব

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিনকে নিয়ে গণমাধ্যমে একতরফা সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কমিশনের সচিব মাহবুব হোসেন। গতকাল রবিবার দুদক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। মাহবুব হোসেন বলেন, শরীফ উদ্দিনকে অপসারণের আদেশ জারির পর থেকেই বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্টÌনিক মিডিয়ায় একতরফা তথ্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, যা প্রকৃত ঘটনার বিপরীত। উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন দুদকের নির্দেশিকা অনুসরণ করতেন না। তিনি চাকরি বিধি-বিধানের বাইরে গিয়ে অনেক অপকর্ম করেছেন। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১৩টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় শরীফ উদ্দিনকে অপসারণ করা হয়েছে।

দুর্নীতির তদন্তে প্রভাবশালীদের নাম আসায় তাদের চাপে শরীফকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে যেসব বলা হচ্ছে, তা মোটেও সত্য নয় বলে দাবি করেন দুদক সচিব। তিনি বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের কিছু মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতি উদ্ঘাটনের কারণে তাদের প্রভাবে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে, এটা মোটেও সত্য নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো প্রভাব আমলে নেয় না এবং প্রভাবিত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না বলেও দাবি করেন তিনি।

মাহবুব হোসেন বলেন, দুদক একটি সংবিধিবদ্ধ আইনি প্রতিষ্ঠান। আমাদের তদন্ত অনুসন্ধান যারা করে থাকেন, তারা একটা সেট রুলস অনুসরণ করেন। আমাদের বিধানের প্রসিডিংস রয়েছে, আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। অথচ তিনি একসঙ্গে ২৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লিখিতভাবে বন্ধ করে দিলেন, মৌখিকভাবে বন্ধ করে দিলেন ৮টি।

সার্ভিস করেন, তাহলে সার্ভিস রুল মানতে হবে। নিজের মনগড়া কাজ করতে পারবেন না। তিনি বলেন, ‘আপনি কমিশনের নিয়ম মানবেন না। অনুমোদন ছাড়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করবেন। আমার কোনো কিছুই আপনি মানবেন না, কমিশন কেন আপনাকে রাখবে? তিনি যদি চাকরিবিধি না মানেন, অফিস ব্যবস্থাপনা না মানেন, তাহলে তো হার্ডলাইনে যেতেই হবে।’

সচিব বলেন, কর্মচারীদের অসদাচরণ ও অন্যান্য অপরাধের জন্য শৃঙ্খলা এবং আচরণবিধি রয়েছে। দুদক (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) বিধিতে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অপসারণের বিধান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি অনুযায়ী দুদক ছাড়াও দেশের অন্য বহু দপ্তরে এরকম আইন ও বিধি বিদ্যমান। সেসব দপ্তর/প্রতিষ্ঠান শঙ্খলার স্বার্থে প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করে। কমিশনের শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে শরীফ উদ্দিনকে ৫৪ (২) বিধিমতে অপসারণ করা হয়েছে। কমিশনের সভায় বিস্তারিত আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মাহবুব হোসেন বলেন, শরীফ উদ্দিনকে অপসারণের আদেশ জারির পর থেকেই বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্টÌনিক মিডিয়ায় বিষয়টি প্রচারিত হচ্ছে। মূলত একতরফা তথ্যের ভিত্তিতেই এই সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, যা প্রকৃত ঘটনার বিপরীত। অপসারণকৃত উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন দায়িত্ব পালনকালে, যে কোনো অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ বা কম গুরুত্বপূর্ণ যাই হোক না কেন, দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মচারীই নির্ভয়ে এবং নির্মোহভাবে দায়িত্বপালন করেন। কিন্তু শরীফ উদ্দিনের মতো কোনো অজুহাত তারা উৎথাপন করেন না।

দুদক সচিব বলেন, প্রকৃত অপরাধ ও কর্মের দায় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শরীফ উদ্দিন কিছু মামলাকে গুরুত্বপূর্ণ মামলা বলে প্রচার করে ওই মামলা/অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছেন। তাই প্রভাবশালীদের চাপে তাকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন এবং মিডিয়ায় তাই প্রচার করা হয়েছে, যা প্রকৃত ঘটনা নয়।

শরীফ উদ্দিনের এসিআরে কেন তাঁর কার্যক্রমকে অতি উৎতম বলা হয়েছিল, সে প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, সম্ভবত ২০১৪ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। স্বভাবগত কারণে তাদের উৎসাহিত করার জন্য এবং তখন যেসব কাজকর্ম করেছেন, সেটির মূল্যায়ন করা হয়েছিল (এসিআরে অতি উৎতম লেখা হয়েছিল)। তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে যেসব তথ্য-উপাত্ত আপনাদের দিয়েছি, আপনি আজ যে অবস্থানে আছেন, এক দিন পর, দুই দিন পর সে অবস্থানে থাকবেন কি না, তা আপনিও জানেন না, আমিও জানি না। তাঁর সিকোয়েন্সিয়াল যে মূল্যায়ন, সেটা তো আমলে নিতে হবে।’

ভীতিকর পরিস্থিতির অবসান চান দুদক কর্মকর্তারা

এদিকে দুদকের আলোচিত কর্মকর্তা মো. শরীফ উদ্দিনকে চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার অবসান চান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। পাশাপাশি দুদক চাকরিবিধি ২০০৮ এর ৫৪ এর ২-কে বিতর্কিত উল্লেখ করে এই ধারা বাতিল চেয়েছেন তারা। রবিবার কমিশনের সচিব মাহবুব হোসেনের কাছে দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে একটি আবেদন জানানো হয়। সেই আবেদনে বিতর্কিত ৫৪ (২) বিধি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবেদনে উল্লেখ করা হয় যে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ হতে ৫৪ (২) ধারার বিষয়ে আপিল বিভাগে যে রিভিশন করা হয়েছে সেটি প্রত্যাহারের মাধ্যমেই বাতিলের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। দুদক সচিব আশ্বস্ত করেন যে তাদের আবেদনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে অপসারণ করা হয়। পরদিন তাকে চাকরিতে বহালের দাবিতে সচিব বরাবর স্মারকলিপি দেন তার সহকর্মীরা। একই সঙ্গে দুদক কার্যালয়ের সামনে তারা মানববন্ধন করেন। এদিকে চাকরিচ্যুত শরীফ উদ্দিন চৌধুরীর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে হাইকোর্টকে চিঠি পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের ১০ আইনজীবী। তারা গতকাল রবিবার সকালে বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মুস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ চিঠি পাঠিয়েছেন। এছাড়া তার নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয় আদেশ এবং চাকরিচ্যুতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেলকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।

%d bloggers like this: