Home > বিনোদন > অ্যাকশন-কাটে সীমাবদ্ধ পরিচালক, কলকাঠি নাড়েন ‘ভাই-ম্যাডাম’

অ্যাকশন-কাটে সীমাবদ্ধ পরিচালক, কলকাঠি নাড়েন ‘ভাই-ম্যাডাম’

ঢাকাই চলচ্চিত্রের পড়ন্ত সময়ে প্রচার মাধ্যমগুলোতে সিনেমা নিয়ে আলোচনা খুব বেশিদিন থাকে না। গত দুই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা নির্মাণের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। এমনকি মুক্তির পরও সংবাদমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাগুলো নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা লক্ষ্য করা গেছে। এ তালিকায় রয়েছে- ‘আয়নাবাজি’ ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ‘ডুব’ ও ‘স্বপ্নজাল’। উল্লেখিত সিনেমাগুলো নির্মাণের শুরু থেকেই দর্শক মনে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছিল। এর একটি অন্যতম কারণ এগুলোর নির্মাতা। তারা স্বনামধন্য এবং নিজগুণে অধিক পরিচিত।

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় চারশ সিনেমার নাম বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে নিবন্ধন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুটিং শেষ করে ২০১৬ সালে মুক্তি পায় ৫৭টি, ২০১৭ সালে ৫৫টি এবং ২০১৮ সালে এ পর্যন্ত ৩০টির মতো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এসব সিনেমার মধ্যে কমপক্ষে ৭-৮টি সিনেমা ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে। সফল হলেও এসব সিনেমা আলোচনায় ছিল মাত্র কয়েকদিন। এর একটি কারণ সিনেমাগুলো ছিল তারকানির্ভর। ঈদ বা কোনো উৎসবে তারকানির্ভর সিনেমা মুক্তি দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে দু-একটা ব্যবসায়িকভাবে সফল হলেও আলোচনা সর্বোচ্চ সপ্তাহখানেক থাকে। কিন্তু উপরে উল্লেখিত চারটি সিনেমার মধ্যে অন্তত তিনটি সিনেমা বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। এ সিনেমাগুলো তারকানির্ভর নয়। এই চারটি সিনেমা পরিচালক নির্ভর। স্বাভাবিক কারণেই বলা যায়- পরিচালক নির্ভর সিনেমার জোরটা একটু বেশি। ঢাকাই চলচ্চিত্রের অতীতে দৃষ্টি দিলে খুব স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা যাবে পরিচালক নির্ভর সিনেমা বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পরিচালকের নামের কারণেও সিনেমা চলেছে। যেটা গত কয়েক বছরে প্রমাণিত। যদিও আলোচিত এসব সিনেমার সবগুলো ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে পারেনি।

চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সকল খুঁটিনাটি, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও অন্যান্য কলাকুশলীদের সকল বিষয়ে নির্দেশ প্রদান ও ভালো-মন্দের দিকগুলো বিবেচনা বা দেখাশোনা করে এবং একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে সর্বোত্তম পরিশ্রম করে থাকেন পরিচালক।পরিচালকের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেন নৃত্য পরিচালক, ফাইট ডিরেক্টরসহ অন্যান্যরা। এজন্য চলচ্চিত্র পরিচালককে ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ’ বলা হয়। আবদুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, এহতেশাম, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত, শিবলি সাদিক, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আমজাদ হোসেন, দিলীপ বিশ্বাস, চাষী নজরুল ইসলাম, মতিন রহমান, শহিদুল ইসলাম খোকনসহ জনপ্রিয় চিত্র নির্মাতারা এদেশে অসংখ্য সুপার হিট চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন।এসব পরিচালকের খ্যাতির কারণে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা মুক্তি পেত। তাদের পারিশ্রমিকও ছিল অভিনেতাদের তুলনায় অনেক বেশি। সময়ের সঙ্গে পরিচালকদের পারিশ্রমিক কমেছে। অনেক পরিচালক তার ভাবনা, দর্শন অনুযায়ী সিনেমার কাজ না পাওয়ার কারণে নির্মাণ থেকেও দূরে সরে যাচ্ছেন।কর্মহীন দিন অতিবাহিত করায় অনেকে অর্থ কষ্টেও ভুগছেন। একটা সময় প্রযোজক সিনেমায় অর্থ লগ্নী করার জন্য পরিচালকদের দারস্থ হতেন। এখন উল্টে গিয়ে পরিচালক প্রযোজকের দারস্থ হচ্ছেন। এছাড়া ইদানিং অধিকাংশ সিনেমার প্রযোজক নিয়ে আসেন সিনেমার নায়ক বা নায়িকা। আবার অনেক সময় এসব নায়িকা নিজেদের প্রযোজক বলেও দাবি করেন। মূল প্রযোজক আড়ালেই থাকেন। তাই যদি না হয় তাহলে প্রশ্ন হলো- এসব নায়িকার টাকার উৎস কোথায়? উত্তর পাওয়া খুব কঠিন কিছু নয়। অধিকাংশ সময় নায়ক বা নায়িকা পছন্দের নির্মাতাকে নিতে বাধ্য করেন প্রযোজককে। এমনটাও হয় নায়কের বা নায়িকার দয়ায় কাজের সুযোগ পান নির্মাতারা। কিন্তু অতীতে পরিচালক নির্ধারণ করতেন কে হবেন সিনেমার অভিনয়শিল্পী।

বর্তমানে সিনেমার শুটিং সেটগুলোতে গেলে চোখে পড়ে নির্মাতা একটি ছোট্ট চেয়ারে বসে আছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় নায়ক বা নায়িকার জন্য। অপেক্ষা শেষে নায়ক সেটে প্রবেশ করা মাত্রই ‘ভাই আসছে’ ‘ভাই আসছে’ বলে নড়েচড়ে বসেন সেটের অন্যান্যরা। এদিকে ভাইকে একটু শান্তি দেয়ার জন্য সেটে কত না আয়োজন থাকে! শুধু কি তাই, ভাই ইচ্ছেমতো নায়িকা পছন্দ করেই খান্ত হন না, মাঝে মাঝে ভাইয়ের ইচ্ছেমতো শটও পরিচালককে নিতে হবে। পরিচালক শুধু এখন ‘অ্যাকশন-কাট’ বলার দায়িত্বটাই পালন করছেন।

এদিকে নায়িকাদের দৌরাত্ম্যও কম নয়। সিনেমার অধিকাংশ প্রযোজক নায়িকারাই নিয়ে আসেন। এমন হচ্ছে অহরহ নায়িকার বয়ফ্রেন্ডই সিনেমা প্রযোজনা করছেন। এখানে নির্মাতাকে শুধু অ্যাকশন কাটে সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। নায়িকার কথামতো পোশাক পরিধানসহ শুটিং করতে হচ্ছে নির্মাতাদের। পরিচালককে ছাড়াই ইদানিং অহরহ গানের শুটিং হচ্ছে। এমনকি মাঝপথে পরিচালককে বাদ দিয়ে প্রযোজক নিজেই পরিচালক বনে যাচ্ছেন। খান আতাউর রহমান মেকআপ রুমে ঢুকলে নায়করাজ রাজ্জাক সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছেন। এখন মেকআপ রুমে ঢুকেই দেখা মেলে নায়ক-নায়িকা পা তুলে চেয়ারে বসে আছেন। পরিচালক এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এখন শট আছে’। উত্তরে শিল্পী বলেন, ‘যান যান আসতেছি।’ যে ঘরে ছেলে বাবাকে ধমক দিয়ে বাবার মাথা নত করে, সেই সংসার কি সুখের হতে পারে? পরিচালকের যে মেধা, স্বাধীনতা এটা এখন প্রায় উঠেই গেছে। আজকে একটা মেধাসম্পন্ন পরিচালককে নকল করে সিনেমা বানাতে হয়। তাদেরকে ছেড়ে দেয়া উচিৎ মৌলিক ও স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য।

এছাড়াও শিল্পী সংকটে সুযোগ পেয়ে বসেছেন প্রতিষ্ঠিত নায়ক বা নায়িকারা। প্রতিষ্ঠিত নায়ক চলচ্চিত্রের বাজারের কথা তোয়াক্কা না করেই দর হাঁকিয়ে বসেন পাহাড় সমান। এরপর সঙ্গে নিতে হবে পছন্দের নায়িকা। এ ধরনের কাজ প্রতিষ্ঠিত নায়িকারাও করছেন। পারিশ্রমিক পাকা দশ লাখ হলেই হলো! কি সিনেমা বা কেমন গল্পের সিনেমা এটা দেখার প্রয়োজনও নেই তাদের। শুটিংয়ের সময় এরা সঙ্গে আট-দশজন লোক নিয়ে সেটে থাকেন। ফলে নায়িকার সঙ্গে সবার দায়িত্বটাও নিতে হয় প্রযোজকদের। এ বিষয়ে পরিচালক কিছু বলতে চাইলেই শুটিং ফাঁসিয়ে দেয়া হয়। এত কিছুর পরও কোনো প্রতিকার নেই। তাই বাধ্য হয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন নির্মাতারা।

‘ভাই’ আর ‘ম্যাডাম’-এ ঢাকাই সিনেমার করুণ পরিণতি হয়েছে। এখন আর ‘পরিচালক স্যার’ এসেছেন এমন শোনা যায় না। আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে একজন পরিচালককে নামে মাত্র ক্যাপ্টেন হিসেবে রাখা হয়। এমন দৃশ্য যখন আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, এজন্যই কী চলচ্চিত্রের আজ বেহাল দশা? তবু এর কোনো প্রতিবাদ নেই! চলচ্চিত্রে নির্মাতারা ক্রমাগতভাবে প্রযোজক বা শিল্পীদের দারস্থ হতে হতে এখন তাদের ইমেজ যেন তলানীতে এসে ঠেকেছে। এভাবেই এ দেশের চলচ্চিত্র পরিচালক নামক যে সত্তা রয়েছে তার দাফন হতে চলেছে। তবে এখনো যেসব নির্মাতা তাদের নিজেদের ভাবনা, দর্শন অনুযায়ী সিনেমা নির্মাণ করছেন তারা খুব কমসংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। কিন্তু ‘ভাই-ম্যাডাম’-এর কলকাঠি নাড়ার প্রবণতা থেমে নেই। এর শেষ হবে কবে?

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ