Home > ইসলাম ও ইতিহাস > ইসলামে কুরবানী কি ?

ইসলামে কুরবানী কি ?

তামিম সিফাতুল্লাহ: ইসলামে কুরবানী কি?
মুলকথা:-
পৃথিবীতে এখন প্রায় সকলেই জানা কুরবানী আসলে কী? সাধারণত মুসলমানেরা একে ঈদ হিসাবে পালন করে থাকে।

এই কুরবানী শব্দের অর্থ আত্নত্যাগ। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে বিশেষ কয়েকটি দিনে বিশেষ পদ্ধতিতে কতিপয় চতুষ্পদ প্রানী জবেহ করাকে কুরবানী বলা হয়।

কুরবানী করা সেই ব্যক্তির উপর ওয়াজিব যে নেসাব পরিমান সম্পদের মালিক।
যে ব্যক্তির উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব সে ব্যক্তির উপর কুরবানী করাটাও ওয়াজিব।

শরীয়তের বিধান অনুযায়ী জিলহজ্জ মাসের দশ (১০) তারিখ সকাল হতে বার (১২) বার তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়।
তবে বর্তমান সময়ে মুসলমান রা ১০ তারিখেই বেশী কুরবানী করে থাকে।
এবং এই দিন টিকে তারা আনন্দের দিন হিসাবে পালন করে থাকে।
কুরবানী করা মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করার একটি অন্যতম মাধ্যম। আর এই কুরবানী করা মহান রাব্বুল আলামীন এর কাছে খুবই প্রিয়। যেমন:-রাসুল (সা) বলেছেন কুরবানীর পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা এক একটি করে নেকী দিয়ে থাকেন।
এ ছাড়া ও কুরবানীর বেশী অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে।

কুরবানীর ইতিহাস:-
কুরবানীর ইতিহাস সকলেরই জানা রয়েছে। এই ইতিহাস টি নতুন কোণ ইতিহাস নয়।পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ব প্রথম কুরবানী করেছেন হাবীল ও কাবীল তাদের কুরবানীর কারন ছিল একটি নারী।
হযরত আদম(আ) এর শরীয়তে ভাই বোনের মধ্যে বিবাহ বৈধ ছিল। তখন মা হাওয়া (আ) এক সাথে দুটি নবজাতককে জন্ম দিতেন। যার একটি হত মেয়ে আর অপরটি ছেলে এবং হযরত আদম প্রথম জন্ম নেওয়া মেয়েকে দ্বিতীয়বার জন্ম নেয়া ছেলের সাথে বিবাহ দিতেন এবং দ্বিতীয় বারে জন্ম নেওয়া মেয়েকে প্রথম বারে জন্ম নেয়া। ছেলের সাথে বিবাহ দিতেন। এ নিয়মেই চলতে লাগল বহুদিন। বাধ সাধল হাবীল ও কাবীলের বেলায়। তখন কাবীলের সাথে জন্ম গ্রহন কারিনী মেয়েটি ছিল খুব রুপবতী সুন্দর, আর হাবীলের সাথে জন্ম নেয়ে মেয়েটি ছিল কুৎসিত, কালো। তাদের বিবাহের সময় ঘনিয়ে হযরত আদম (আ) পূর্বের নিয়মানুসারে বিবাহ দেয়ার প্রস্তুতি নিলেন।কিন্তু কাবিল এতে অসম্মতি জ্ঞাপন করল ও জেদ করে ফেলল যে তার নিজের দাবিতেই অটল, হযরত আদম (আ) তাদেরকে এই বিষয়ে মীমাংসা করার জন্যে কুরবানী করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন যার কুরবানী কবুল হবে তাকেই ই রুপসী পাত্রীর সাথে বিবাহ দেওয়া হবে। তখন হাবিল ছিল মেষপালক সে তার মেষের পাল হতে সবচেয়ে উত্তম মেষটি আল্লাহর রাহে কুরবানী করল। আর কাবিল ছিল কৃষিজীবী সে কিছু শষ্যদানা আল্লাহর রাহে কুরবানী করল। দেখা গেল আকাশ হতে অগ্নি হাবিলের কুরবানীকে ভস্মিভুত করে দিল। কাবিলের কুরবানী অমনিতেই পড়ে থাকল।
ওটা দেখে ক্ষোভে, দুঃখে হাবিলকে হত্যা করল এবং পৃথিবীর বুকে সর্ব প্রথম রক্তপাত এর সুচনা করল। আর তাই জন্যে পৃথীবিতে যত হত্যাকান্ড সংঘটিত হবে এবং হয়েছে সব কিছুরই এক অংশ কাবিলের আমল নামায় লিপিবদ্ধ করা হবে।

কুরবানীর এ পদ্ধতি চলছিল বহুদিন। যুগ এল ইব্রাহিম খলীলুল্লাহর ( আ) ইসমাইল জীবহুল্লাহর (আ)। আর তাদের মাধ্যমেই প্রচলন হলো বর্তমান যুগের কুরবানী। আর তাদের মাধ্যমেই আল্লাহ রহিত করে দিলেন আদি যুগ হতে চলে আসা কুরবানীর রীতি। অবৈধ করা হলো চতুষ্পদ প্রানী ছাড়া অন্য কোন জিনিস বা প্রানী কুরবানী করা। আর রহিত করা হলো কুরবানী কবুল হওয়া না হওয়ার চাক্ষুষ রীতিকে। আর কার কুরবানী কবুল করা হলো আর কার কুরবানী কবুল করা হলো না, তা এক করেই গোপন রাখা হলো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজিদে বলেন :- আল্লাহর কাছে পৌছে না তোমাদের কুরবানী কৃত বস্তুর গোশত বা রক্ত তবে তোমাদের তাকাওয়া বা খোদা ভীতিই আল্লাহর কাছে পৌছে।

হযরত ইব্রাহিম (আ) কে বহুভাবে পরিক্ষা করার পর আল্লাহ তাকে খলীলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করেন। আর আমাদের প্রচলিত নিয়মের কুরবানী চালু করার ক্ষেত্রেও তিনি এক মহা অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এমনকি হযরত ইব্রাহিম (আ) আশি বছর বয়সে একটি সন্তান প্রাপ্ত হন। বেশ সুন্দর করে তার নাম রাখলেন ইসমাইল , আনন্দে আনন্দে শিশু ইসমাইল কে কোলে নিয়ে জিবনটা কাটবে ভেবেছিলেন ইব্রাহিম (আ) আর তখনই ঐশী বানী নির্দেশ এল তুমি তাকে তার মা সহ মক্কার জন মানবহীন স্থানে রেখে আস। ঐশী নির্দেশের জন্য মহান আল্লাহর জন্য কোরবানী হযরত ইব্রাহিম (আ) নির্দেশ পাওয়া মাত্রই অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদেরকে নির্বাশনে রেখে আসলেন মক্কার বালুকাময় প্রান্তরে। হযরত ইব্রাহিম (আ) এর পরিক্ষা এখানেই শেষ নয়। ধীরে ধীরে শিশু ইসমাইল বড় হতে লাগলেন। তার পিতা তাকে মাঝে মধ্যে দেখে আসতেন। এ ভাবেই কেটে গেলো বহুদিন। একদিন হযরত ইব্রাহিম (আ) কে নির্দেশ দিলেন তার প্রিয় বস্তু কুরবানী দিতে। তিনি তার অনেক বরকি, উঠ, দুম্বা কুরবানী করলেন কিন্তু কোনটাই কবুল হলো না। তখন নির্দেশ এল তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কুরবানী কর। তখন তার আর বুঝতে কষ্ট হলো না। মহান আল্লাহ তাকে তার প্রিয় ইসমাইল কে কুরবানী করার জন্যে আদেশ দিয়েছেন। তিনি তার পুত্রকে সাজিয়ে গুছিয়ে রওয়ানা হলেন কুরবানীর গাহে। পথের মধ্যে শয়তান শাধুর বেশে ইব্রাহিম (আ) কে ধোকা দেওয়ার ফন্দি করল। তিনবার হযরত ইব্রাহিম (আ) পাথর মেরে শয়তান কে তাড়াল।
তাই আল্লাহ তায়ালা হাজীদের জন্য কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তার পর তারা কুরবানীর গাহে পৌছে গেলেন। এরপর আদর দিয়ে তাকে সব কথা খুলে বললেন। এরপর ইসমাইল বলল আব্বা আপনি বিচলিত হবেন না। আল্লাহর রাহে কুরবানী হওয়া তো আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। এরপর তিনি বললেন আব্বা মৃত্যুর যন্ত্রনা অনেক কষ্টকর তাই আপনি ছুরি ভালো করে শান দিয়ে নিন আমায় ভালোভাবে বেধে নিন যাতে আমার শরীরের রক্ত আপনার গায়ে না লাগে। আর আপনি আপনার চোখ বেধে নিন। হয়তোবা জবেহের সময় আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে আপনি মায়ার বশবর্তী হয়ে এ কাজ হতে বিরত ও থেকে যেতে পারেন। হযরত ইব্রাহিম (আ) পুত্রের কথাগুলো শুনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সকল কাজ সমাধা করে তাকে জবাই করার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু আল্লাহর কি রহমত তিনি হযরত ইসমাইল এর গলা কাটতে পারলেন না। একে একে তিনবার তিনি চেষ্টা করলেন। আর তিন বারি তিনি ব্যর্থ হলেন। আর তখনই আকাশ হতে অহি এল হে ইব্রাহিম তুমি তো

তোমার পরিক্ষার সফলকাম। আর তুমি তোমার সন্তাককে বুকে তুলে নাও আর জন্নাত থেকে পেরিত দুম্বাকে কোরবানী কর।
আর তোমাদের পরবর্তীদের জন্য এ হুকুম অবধারিত করলাম। আর সে থেকেই কুরবানীর এই প্রচলন চলে আসছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

কুরবানী করার কিছু নিয়ম কানুন:—-

আল্লাহর উউদ্দেশ্যে তাকাওয়া অর্জন করার প্রধান মাধ্যম হলো কুরবানী করা। আর এই কুরবানী করতে হবে হালাল এবং চতুষ্পদ প্রানীকে যেমন:-উঠ,দুম্বা,গরু,ছাগল,ভেড়া, এই গুলো গ্রহনযোগ্য এবং কুরবানীর প্রানী এমন ভাবে ক্রয় করতে হবে যেন এতে কোন খুত বা সমস্যা না থাকে। সবল হতে হবে, এবং জিবেহ করার সময় প্রথমে এই প্রণীর মাথাকে দক্ষিন দিকে পশ্চিম মুখী করে রাখতে হবে। কুরবানী করার সময় একটি দোয়া পাঠ করতে হবে। দোয়াটি হলো বাংলা উচ্চারণ :-ইন্নী ওয়াজ জাহুতু ওয়াজ হিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতী ওয়াল আরদা হানীফা ও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন ইন্নী ছালাতি ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন লা শারিকালাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।
এর পর বিসমিল্লাহি আল্লাহাহি আকবার বলে জবেহ করতে হবে। এর পর একটি দোয়া পড়তে হবে দোয়াটি হলো বাংলা উচ্চারণ :- আল্লাহুম্মা তাকাবলাহ মিন্নী কামা তাকাববালতা মিন হাবীবিকা মুহাম্মাদিন ওয়া খলীলিকা ইব্রাহিম সালাইহিস সালাতু ওয়া সালাম।
কুরবানী সম্পর্কীয় কতিপয় দায়িত্ব্য কর্তব্য :–

(১) দশই জিলহজ্জ ঈদের নামাজের পর থেকে বারই জিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। তবে প্রথম দিন কুরবানী করা উত্তম। ঈদের নামাজের আগে কুরবানী করলে কুরবানী হবে না। এবং রাতের বেলা ও কুরবানী করা মাকরুহ।

(২) কুরবানীর পশু ভেড়া, খাসী,দুম্বা বা এ জাতীয় অন্য কোন প্রানী হলে এটা একজনের নামেই কুরবানী করা যাবে। আবার যদি গরু, উঠ,বা মহিষ হয় তবে সাত জনের নামে কুরবানী করতে পারবে বলে শর্ত হল সকলের অংশই সমান হতে হবে। যদি কর কম বেশী হয় তবে কুরবানী জায়েজ হবে না।

(৩) শরীকী কুরবানীর ক্ষেত্রে সকলের নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে এবং সকলের হালাল পয়সা হতে হবে। যদি কোন একজন হারাম পয়সা বা গোশত ভক্ষনের নিয়তে কুরবানী করে তবে কারোরই কুরবানী হবে না।

(৪) কুরবানীর সাথে আকীকাও করা যাবে।এতে কোন অসুবিধা নেই।

(৫)শরীক কুরবানীর ক্ষেত্রে পাল্লা দিয়ে মেপে গোশত বন্টন করতে হবে। যদি কারো কম বা বেশী হয় তবে কুরবানী কবুল হবে না।

(৬) কুরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য এক ভাগ আত্নীয় স্বজনের জন্য ও এক ভাগ ফকীর মিসকিনের জন্য রাখাটা মুস্তাহাব।

(৭) কুরবানীর পশু দিয়ে চাষ বা অন্য কোন কাজ করা মাকরুহ।

(৮) কুরবানীর চামড়া গরীব দুঃখীদের মাঝে বিতরন করে দেওয়া উত্তম।

(৯)কুরবানীর পশু যদি বকরী, ভেড়া, বা দুম্বা হয় তবে কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে,যদি গরু বা মহিষ হয় তবে অন্তত : পক্ষে দুই বছরের হতে হবে।

(১০) কুরবানীর পশু যদি অন্ধ বা লেংড়া বা শিং গোড়া থেকে ভাঙ্গা থাকে তবে এটা দ্বারা কুরবানী হবে না।

আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে তাকাওয়া অর্জন করার তৈফিক দান করুক।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ