Home > আন্তর্জাতিক > ভারত: ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে

ভারত: ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে

নিউজ ডেস্ক
জনতার বাণী,
বিশ্বায়িত প্রচারের যুগে তামাম দুনিয়া
জানিতে পারে কী দুর্বিষহ বাস্তবে
সংখ্যালঘু কিংবা নিচু জাতের সমাজ এই
দেশে জীবন অতিবাহন করে। কিন্তু
তাহাতে ভারতের তরফে গণতন্ত্র ও
ধর্মনিরপেক্ষতার ঢক্কানিনাদ থমকায়
না।
ভারত যে তাহার অধিকাংশ মানুষকে বাদ
দিয়াই এক অত্যন্ত সফল গণতন্ত্র,
এবং সর্বপ্রকার সংখ্যালঘুকে বাদ
দিয়াই অতীব সার্থক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ,
এই সত্য এখন মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত।
বিশ্বায়িত প্রচারের যুগে তামাম দুনিয়া
জানিতে পারে কী দুর্বিষহ বাস্তবে
সংখ্যালঘু কিংবা নিচু জাতের সমাজ এই
দেশে জীবন অতিবাহন করে। কিন্তু
তাহাতে ভারতের তরফে গণতন্ত্র ও
ধর্মনিরপেক্ষতার ঢক্কানিনাদ থমকায়
না। জাতীয় গৌরব টসকায় না।
অন্যান্য দেশের অসহিষ্ণুতার প্রতি
সর্বভারতীয় ভ্রূকুঞ্চনে ছেদ পড়ে না।
জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিকরা বলেন,
জাতীয় আত্মপ্রত্যয় বস্তুটি মিথ এবং
মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। ভারত তাহা
প্রত্যহ প্রমাণ করে। সুতরাং মিসবা
কাদরি না মে যে মেয়েটিকে মুম্বাইতে
মুসলিম হইবার দোষে ফ্ল্যাট ভাড়া
দেওয়া হয় নাই, কিংবা জিশান আলি খান
নামে যে ছেলেটিকে ধর্মপরিচয়ের জন্য
চাকরি দেওয়া হয় নাই, তাহা লইয়া
আপাতত বহু কণ্ঠ বহু স্বর ধ্বনিত
হইতেছে ঠিকই, কিন্তু অচির ভবিষ্যতেই
সব স্বর নিবিয়া যাইবে।
অসংখ্য বৈষম্যকাণ্ডের মতো ইহারাও
সময়প্রবাহে জনমানস হইতে বেবাক
ভাসিয়া যাইবে। গণতন্ত্র ও
ধর্মনিরপেক্ষতার দুই স্তম্ভকে কুর্নিশ
করিয়া কুণ্ঠিত ভাবে খুচরা সংবাদ হইয়া
বাঁচিয়া থাকিবে। ভারত আবার
জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনের উমেদারি
শুরু করিবে। মিসবা, জিশান আলিরা তো
বটেই, এমনকী শাবানা আজমিরাও বুঝিয়া
গিয়াছেন যে এই রাষ্ট্রীয় শ্রেষ্ঠত্বের
বিশ্বজোড়া মহিমময় আলেখ্যে তাহারা
নেহাতই অনুল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।
ছোট ঘটনা।
এই আপাদমস্তক অন্যায় আলেখ্য
অনেক যুগের উত্তরাধিকার। তবুও
একটি কথা ভাবিবার। সময়ের সঙ্গে
সঙ্গে কি এই নির্লজ্জ দ্বিচারিতা
বাড়িতেছে? মুসলিমদের বাড়ি ভাড়া
দেওয়া লইয়া সব কয়টি মেট্রোপলিসেই
সংখ্যাগুরুসুলভ বিরক্তি ও বিদ্বেষের
বাস্তব অনেক পুরানো। কিন্তু এই
বৈষম্য পালন ও যাপনের স্পর্ধা,
নির্লিপ্ততা ও অহমিকা এত উজ্জ্বল
ও প্রত্যক্ষ ছিল না।
প্রকাশ্য বিজ্ঞাপনে মুসলিমদের বাদ
দিবার প্রতিশ্রুতি এমন করিয়া শোভিত
হইত না। প্রচারমাধ্যমে সান্ধ্যকালীন
অধিবেশনে রাজনৈতিক দলের সদস্যরা
আগে এমন গলা ফুলাইয়া মুসলিম-
বিবর্জিত পাড়ার প্রয়োজনীয়তা ও
উপযোগিতা ব্যাখ্যা করিতেন না।
হয়তো আর একটু রাখিয়া ঢাকিয়া,
প্রতীক ও প্রবঞ্চনার আড়ালে
লুকাইয়া তাহাতে প্রবৃত্ত হইতেন।
কোন গভীর সমাজনৈতিক বা রাজনৈতিক
পরিবর্তন এই প্রচ্ছন্নতার আড়াল
একটু একটু করিয়া খসাইয়া দিতেছে,
তাত্ত্বিকরা তাহা ভাবুন। কিন্তু মিসবা
কিংবা জিশান আলিদের অপাংক্তেয়
সমাজের আস্থা কী ভাবে ফিরাইয়া
আনা যায়, তাহা প্রত্যেকের ভাবনা।
ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়
নিরপেক্ষতার মঞ্চগুলিতে এই ঘটনার
বিচার সুসম্পন্ন হইল কি না, তাহা
নিশ্চিত করা জরুরি। এই ব্যক্তিরা যদিও
ব্যক্তি হিসাবেই বাসস্থান কিংবা চাকুরি
পাইতে গিয়াছিলেন, কিন্তু তাহাদের
ব্যক্তি-পরিচয় ছাপাইয়া সমাজ-
পরিচয়টিকে বড় করিয়া, ভিন্ন করিয়া
দেখাইবার এই বিপজ্জনক প্রক্রিয়ার
সূত্রে কিন্তু তাহাদের ক্ষেত্রটি আর
ব্যক্তি-ক্ষেত্র থাকে নাই, বৃহত্তর
সমাজের প্রশ্নে পরিণত হইয়াছে।
মিসবার প্রতি সুবিচার তাই আর কেবল
তাহারই জন্য জরুরি নয়, তাহার
নামপরিচয়ের সমাজটির জন্যও জরুরি।
এই অন্যায়ের প্রতিকার করিতে হইবে,
এবং প্রতিকারের সংবাদ সংশ্লিষ্ট
সমাজের গোচরে আনিতে হইবে: দায়
এখন একটি নয়, দুইটি।
শুক্রবার আনন্দবাজার পত্রিকায়
প্রকাশিত সম্পাদকীয়

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ