Home > মানবাধিকার > পথশিশুদের নেশার রাজা ড্যান্ডি

পথশিশুদের নেশার রাজা ড্যান্ডি

মাইনুল হাসান: আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এখন ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ সকল মাদক বেচাকেনা চললেও মরণ নেশা ড্যান্ডি সেবন প্রকাশ্যেই চলছে।
ড্যান্ডির উপকরণ সলিউশন বিক্রিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় এই নেশায় আসক্তের সংখা বাড়ছে। ড্যান্ডি সাধারণত জুতার সোল লাগানোর কাজে লাগে। যেকোনো হার্ডওয়ারের দোকানে যে কেউই কিনতে পারে সলিউশন। বিশেষ করে রাজধানীর পথশিশুরাই এ নেশায় আক্রান্ত।

রাজধানীর গুলিস্তান, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকেশ্বরী ফার্মগেট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ ফ্লাইওভার ও ফুলের মার্কেট, সিদ্দিকবাজার, বঙ্গবাজার, সদরঘাট, নয়াবাজার ব্রিজের নিচে, কাটাবনসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব নেশা প্রকাশ্যেই চলছে।

গতকাল সকালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিতুমীর হলের সামনের রাস্তার ফুটপাতে এবং বকশিবাজার মোড়ের পশ্চিম পাশের ময়লার ডাস্টবিনের কয়েকজন কিশোর গোল হয়ে বসে পলিথিনের ভেতর বাতাস দিয়ে নেশা করছেন।

তাদের প্রত্যেকের হাতে বাতাস ভর্তি ফোলানো পলিথিনের প্যাকেট ছিলো। কিছুক্ষণ পরপর পলিথিনের মুখে নাক লাগিয়ে টান দিচ্ছে। সব কিশোরই করছে এ কাজ। পথেঘাটে বাসস্টান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট এলাকায় এদের পদচারনা বেশি লক্ষ্য করা যায়।

ড্যান্ডি সেবনকারী কিশোররা জানায়, তারা সারাদিন কাগজ, প্লাস্টিক সামগ্রী, লোহাজাতীয় বস্তু টোকায়। পরে তা স্থানীয় ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে। এসব দ্রব্যের নির্ধারিত কোনো মূল্য নেই।

ভাঙ্গারি দোকানির ইচ্ছা অনুযায়ী যখন যা দেয় তা নিয়েই খুশি থাকে পথশিশুরা। দিনশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন আড্ডায় বসে এরা তখনই মাতে ড্যান্ডি নেশায়। প্রথমাবস্থায় হার্ডওয়ারের দোকানে গিয়ে সলিউশন কিনে আনতো।

কিন্তু বারবার একই দোকানে গেলে দোকানদাররা সন্দেহ করে। অনেকেই জানতে চায় কোন দোকানে কাজ করে। এসব পথশিশুর বেশিরভাগই নিজেদের জুতা সেলাইয়ের কাজ করে বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ পরিচিত হয়ে গেলে আর দোকানে গিয়ে সলিউশন কিনতে পারে না।

তখন সরণাপন্ন হয় ভাঙ্গারি দোকানির। আর ভাঙ্গারি দোকানি নিজের স্বার্থে হার্ডওয়ারের দোকান থেকে সলিউশন সংগ্রহ করে পথশিশুদের সরবরাহ করে থাকে। শিশুরা জানায়, কাগজ বা প্লাস্টিক সামগ্রির বদলে অনেক সময় সলিউশন দেয় ভাঙ্গারি দোকানিরা।

এক কৌটা সলিউশনের দাম ৫০ টাকা। তিন-চারজন মিলে এক কৌটা কেনে এরা। আবার কখনো কেউ একা কিনলে তা চলে দিনভর। সেবনকারিরা জানায়, এক কৌটা দিয়ে তিনচারদিন চলে। পলিথিনের মধ্যে যতক্ষণ সলিউশনের গ্যাস থাকে ততক্ষণই টানা যায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গছে, ৮ থেকে ১০ বছর বয়সের শিশুরা সাধারণত গাঁজা, সিগারেট ও গাম সেবন করে। আবার ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সিরা ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবন করে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-তরুণদের নেশার অন্যতম উপকরণ ইয়াবা। তবে অধিকাংশ পথশিশু ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত।

কমলাপুর রেলস্টেশনে ১০ বছরের শিশু আফসার নামের একজনের সাথে সে জানায়, আমার সঙ্গে আমার অনেক বন্ধুরা থাকে। তারা সবাই আঁঠা খায়, তাই ওদের দেখাদেখি আমিও খাই।

রেলের ধারে বসে পথশিশুরা আরও জানায়, তাদের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। সারাদিন ময়লা আবর্জনা থেকে কাগজ ও প্লাস্টিক কুড়িয়ে ভাঙাড়ির দোকানে বিক্রি করে দুইশ থেকে তিনশত টাকা আয় করে। এরপর বিকালে রেললাইনে বসে ড্যান্ডি নিয়ে। যেদিন টাকা কম হয় সেদিন গাঁজা সেবন করে বলে জানায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম জানান, এই ডান্ডির মূল উপাদান হচ্ছে টলোইন, এইটা হচ্ছে মাদক। এজন্যই ড্যান্ডিকে আমরা মাদক হিসেবেই দেখি।

অপর একজন কর্মকর্তা জানান, ড্যান্ডি দিয়ে নেশার প্রকোপতা সম্পর্কে আমাদের দেশে এখনো সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।

গত দুই দশক ধরে এই প্রকার নেশায় আসক্তদের সংখ্যা আমাদের দেশে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সাধারণত সহজপ্রাপ্যতা, সহজলভ্যতা ও আইনত নিষিদ্ধ পদার্থ হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় এই প্রকার নেশার প্রকোপ যেন এক মহামারি রূপ নিয়েছে।

এই নেশার কালো থাবা যেন আজ সমাজের নিম্নশ্রেণি হয়ে মধ্যবিত্ত সমাজে বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছে। এক্ষেত্রে হার্ডওয়ারের দোকানগুলোতে সলিউশন বিক্রির বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ