Home > সাহিত্য ও সংস্কৃতি > বারবনিতা এসোসিয়েশন – চন্দন আনোয়ার

বারবনিতা এসোসিয়েশন – চন্দন আনোয়ার

এক রাতে নরমেধের বর্বরতার আনন্দ আমাকেও নিতে হয়।

সরকারি চাকুরি নিয়ে আসি ছোট্ট এই শহরে। এসেই পড়ি বিস্ময়কর এক নারী আন্দোলনের মুখে।’বারবনিতা এসোসিয়েশন’ নামে এখানে একটি গোপন নারী সংগঠন আছে। এবার প্রকাশ্যে এরা মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী দিবে।

ব্যানার-ফেস্টুনে দাবি লিখে মৌনমিছিল নিয়ে শহর ঘুরে বেড়িয়েছে একদিন। এই গণতান্ত্রিক দাবির পক্ষে খুব সহজেই ওরা আমাকে পেয়ে যায়। কিন্তু তা ছিল শুধুমাত্র এক মিটিঙে। দুইদিন পরে দ্বিতীয় মিটিঙে মেয়রের দফতরে পুলিশ অফিস ও ডিসি অফিসের বড় বড় কর্তাদের সামনে ওদের দাবির বিরোধী হয়ে যাই। মিটিঙের সামনের সারির কর্তারা যেভাবে তাকাচ্ছিলেন, আমার মতো নবীন কর্মকর্তার চাকুরিটাই না শেষে খেয়ে ফেলে! ভাগ্য ভাল, ভুল করেছি বলে ক্ষমা চেয়েছি এবং ভবিষ্যতে এই ভুল হবে না বলে মুচলেকা দিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে নিয়েছি।

প্রত্যেক ঘটনার পেছনের একটি ঘটনা থাকেই। বারবনিতারা এতটা সংগঠিত হলো কি করে? কোন এনজিও-টেনজিও পেছন থেকে কাঠখড়ি দিচ্ছে না তো ? কলকাঠি নাড়ছে না তো? ‘বারবনিতা এসোসিয়েশন’ ! সে কি বিস্ময়কর কথা। মোটের উপরে জোরালো কৌতূহল-ই জন্মেছে। কিন্তু নতুন শহর, নতুন চাকুরি, অবিবাহিত এবং অতিশয় যুবক এসব বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বেশি কৌতূহল দেখালে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

একটি রুম ভাড়া নিয়ে মেস বানিয়ে থাকেন দুই অফিসার। আপাত ভাঙা মাসের ক-দিনের জন্য থাকার ব্যবস্থা তাদের সাথেই হয়। রাত দশ-এগারোটা পর্যন্ত তারা আমার সাথে সহজাত ব্যবহার-ই করে। তারপরেই কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। ননস্টপ সিগারেট চলে। দু-জনের সাংকেতিক ভাষার ফিসফিসানি মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে সহজে ঘুমাতে দেয় না। অনেক রাত হয় ঘুমাতে। এক সপ্তাহ ধরেই চলছে এরকম। একদিন ঘুমানোর ভান করে নাক ডাকতে শুরু করি। তখনি শুনতে পাই দু-জনের ফিসফিসানি।

একজন বলছে, যাবেন নাকি ওদিকে একবার…

দ্বিতীয়জন বলছে,  নটিরা ক্ষ্যাপে আছে যে…

দিন যাচ্ছে, আর ‘বারবনিতা এসোসিয়েশন’কে ঘিরে আমার কৌতূহল বেড়েই চলছে। দুই সহকর্মী এসোসিয়েশনের সদস্যআমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে আছি। এসব কাজে বিড়াল তপস্বী হতে হয়। দুর্নীতিবাজ, নারীবাজ এসব বাজরা দারুণ ধূর্ত আর প্রয়োজনে হিংস্র হয়। কী বলে শেষে কী বিপদে পড়ি সেই ভয়ে চুপসে আছি।  অফিসের বেয়ারা ধূরন্ধর ও চালাক প্রকৃতির এক প্রবীণ লোক। ও কী করে ধরে ফেলেছে আমার কৌতূহলের খবর। ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা-ই বলে। আমি শুধু মুখ থেকে বের করেছি,বারবনিতা এসোসিয়েশন …

আর রক্ষে নেই। একটানে সব বলে তারপর থামল। এই শহরে লিলাবালা নামে এক জাঁদরেল বারবনিতা আছে। ‘বারবনিতা এসোশিয়েশন’ নামে তার একটি শক্তিশালী সংগঠনও আছে। সদস্য অনেক। তবে দৃশ্যমান সদস্য কম, গোপন সদস্য-ই বেশি। লিলাবালা অসম্ভব কৌশলী, বুদ্ধিমান ও অল্পশিক্ষিতা। এই শহরের নেতা বা মেয়র হতে হলে লিলাবালাকে আগে খুশি করে নিতে হয়।  নেতা বা মেয়রকে খুশি করতেও লিলাবালাকে খুশি করতে হয়। বীজগণিতের অঙ্কের সূত্রের মতো আর কি ! এই শহরের বড় বড় পদের সবাইকে লিলিবালার খুশি নিয়ে ভাবতে হয়।

এতসব যখন বলেছে আর না জেনে উপায় কিওদের এসোসিয়েশনের অফিস কোথায়?

ওদের কীয়ের অফিস স্যার!

উপরমহল জানে না? কাগজে লেখা হয় না?

বেয়ারা এবার হেসে ওঠে, উপরের মহল আবার কে? চল্লিশ বছর ধরে দেখে আসছি, সব সরকার-ই লিলাবালার সরকার। কাগজে কে লিখবে, ওরাও তো লিলাবালার…

এই কালে বারবনিতাদের এই দাপট আজব-ই লাগে। আগের কালে রাজা-বাদশাহদের পুতুলের মতো নাচাত বারবনিতারা। রাণীরা পাত্তা পেত না রাজার কাছে। দেশের এলিটশ্রেণির সম্মান পেত ওরা। রাজাকে শাসাত, রাজদরবার শাসাত, সমাজ শাসাত, মসজিদ-মন্দির এইসব উন্নয়ন কাজে মনোযোগ দিত। ডিজিটাল এই যুগে এই ছোট্ট শহরের সবকিছুই কি করে ওদের কথায় চলে! রাজধানী শহর হলে না হয় এক কথা বলা যেত।  স্বাধীনতার পরে কামিনী-কাঞ্চনে ভরে গিয়েছিল সচিব আমলাদের অফিস, ঘরবাড়ি, হোটেল। এক প্রেমিক রাষ্ট্রপ্রধান তো মোগল সম্রাট বনে গিয়েছিল।  কিন্তু এই সময়ে? মোবাইল-ফেসবুক আছে। দৈনিক পত্রিকাগুলি সব-ই আসে এই শহরে! স্যাটেলাইট চ্যানেল আছে। কীভাবে একজন বারবনিতা রীতিমত সংগঠন খুলে বসেছে? নাকি কোন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা-ফাঁদ?

চেয়ার-টেবিল এখনও পাইনি। বসে আছি স্যারের রুমের সোফায়। বিচিত্র সব লোক ও বিচিত্র সব আলাপে ব্যস্ত তিনি।  আলাপের ফাঁকে দু-একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন বটে, তবে সে তাকানোতে বিরক্তি-ই বেশি। উঠতে বললেই আমি উঠে পড়ি। অস্বস্তি আমার দিকেও শুরু হয়েছে। এরিমধ্যে রাজপাখার মতো পর্দা দুলিয়ে রুমে ঢুকে তিন মেয়েমানুষ। ঢোকার মুহূর্তটি নাটকীয়। আগের দিনে যাত্রামঞ্চে নর্তকী উঠলে যেমন মঞ্চ কেঁপে উঠত, দর্শক নেচে উঠত, নর্তিকী কোমর দুলিয়ে সাপের মতো শরীর প্যাঁচিয়ে দর্শকের দিকে ছুটে আসত, দৃশ্যপট এমন-ই। স্যার হেই করে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন। ওরা কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে সামনে গেল। একজন চেয়ারে পা তুলে বসে, তার কাঁধ ধরে দুইজন দাঁড়ায়।

স্যার অকারণেই দাঁত বের করে হিহি করে হাসছেন।

আমার অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল।

পোশাক, শরীর, ভাবভঙিমায় মেয়েমানুষ তিনজন-ই আধুনিকা। কিন্তু মুখ খুলতেই ওদের ভেতরের খবরাখবর সব বেরিয়ে পড়ে।

ডানপাশেরটা প্রথমে মুখ খুলে লিলা বু, টাইম নাই।

বামপাশেরটা তারপর মুখ খুলে লিলা বু, টাইম নাইক্ক্যা।

এবার লিলা বু মুখ খুলে মিটিঙে কি করলেন?

কোন কারণ ছাড়াই স্যার ক্ষেপে ওঠেন, কিসের মিটিং? কে বলেছে?

ডান ও বাম পাশের ওরা এক পা করে সরে দাঁড়াল। লিলা বু স্যারের সমস্ত শরীর নিজের দুই চোখে বেঁধে ফেলে বলে, বাবুর যে তেজ! যদি…

স্যার আরো তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠেন, হোয়াট ইজ যদি! গেট আউট! কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, যে পরিমাণ তেজ তাঁর কণ্ঠ থেকে বের হচ্ছে, তার শরীর সেই পরিমাণ-ই শীতল।

এবার লিলা বু উঠতে উঠতে বলে, বাবু, আমি লিলাবালা গো! লিলা যোগ বালা। লিলা করলে বালা…

পিঠ ফিরিয়ে-ই লিলাবালা চোখ ফেলে আমার চোখ! একবার ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁপতে লাগল সমস্ত শরীরএ আল্লাহ!

কিন্তু না, ওদের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল দেখা গেল না। এসেছিলে যে ঢঙে, গেল একই ঢঙে। ওদের চেহারায় তেমন কোন পরিবর্তন দেখিনি। চেহারা পাল্টে গেল স্যারের। গলার টাই আলগা হয়ে গেল। শার্টের উপরের তিন বোতাম খুলে ফেলায় পটকামাছের মতো পেটটা বের হয়ে পড়েছে। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, কতগুলি সন্ত্রাসী এসে জীবননাশের হুমকি দিয়ে গেল!

লিলা করলে বালা! লিলাবালার এই কি ভাষা! হুমকির ভাষা কি?

কৃষ্ণলিলার খবর জানি। তবে স্যার কি…

লিলাবালা অপগত যৌবনা। কিন্তু চেহারাটা এখনও জৌলুসে ভরপুর। ওর সাথের দু-জনের দিকে সেভাবে তাকানোই হয়নি।

লিলিবালাকে দেখে কৌতূহলের চাপ আরো বেড়ে গেল। নিবারণ করা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। লিলিবালার সান্নিধ্যে যেতে-ই হবে। যাবার পথ কি সোজা হবে? এই শহরে নতুন এক আগন্তুক একজন বারবনিতাকে খুঁজছে, এর অর্থ কি দাঁড়ায় তাই ভাবছি। যাদের রুমে ছিলাম তাদের পক্ষে মাস শেষ পর্যন্ত রাখা সম্ভব না বলে জানিয়েছেন। রাতে নাকি ঘুমের ডিস্টার্ব হয়। কিন্তু ওরা তো ঘরেই থাকেন না। কীভাবে ডিস্টার্ব হয়, অকৃতজ্ঞের মতো আর জিজ্ঞেস করি কি করে?

অগত্যা একটি হোটেল-ই আশ্রয় হয়। মাসের বাকি ক-দিন এভাবে থেকে ব্যাচেলার মেস দেখে উঠে যাব। এই সময়টা লিলাবালার রহস্য-উদঘাটনের একটা দুর্লভ সুযোগ বটে।

ছোট্ট শহর কিন্তু পায়ে পায়ে আবাসিক হোটেল। হোটেলবয় ছেলেটির ব্যবহার ভীষণ অমায়িক। আমার সেবায় সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে। ঘুরে ফিরে এসে বলছেস্যার, কি লাগবো বলেন? আমি যত-ই বলি কিছু-ই লাগবে না, রাতের খাবার বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি, ছেলেটি তা শুনবে না। ঘুরে ফিরে একই কথা।

তোমাদের শহরে এতো হোটেল কেন? ছেলেটির সাথে আলাপ জমাতে এই কথাটি বললাম। কিন্তু  ও আমার দিকে এমন ভঙিমায় তাকাল, যেন আমি মানুষ-খেকো বাঘ, খাবারের লোভে ছটফট করছি। এবার আর বুঝতে বাকি নেই, ছেলেটি কেন এভাবে ঘুরেফিরে একই বায়না নিয়ে আসছে।

তোমাদের শহরে লিলাবালা… বাক্যটি শেষ করতে দেয়নি ছেলেটি। ক্যাচ ধরার মতো লুফে নিল মুখ থেকে।

স্যার, যাইবেন না ডাকবো। দুইটার ফি দুইরকম।

কে আসবে? কাকে ডাকবে?

ছেলেটা এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে দ্বিতীয় লাফে-ই ঘরে ফিরল। হাতে নিয়ে ফিরল একটা ক্যাটালগ বই।

আমি বললাম না না, এসব না। আমার লিলাবালাকে-ই চাই।

ছেলেটার আশ্চর্য দু-টি চোখে বিস্ময়ের রেখাচিহ্ন! আমার নার্ভাসনেস নেই। কিন্তু ছেলেটাকে বললেই কি বিশ্বাস করানো যাবে, লিলাবালাকে আমার দরকার নিতান্তই কৌতূহল বশে। বিকৃতরুচির পুরুষরা-ই বিগত যৌবনা বারবনিতাদের খোঁজে। ছেলেটি আমাকে নিশ্চিতভাবেই বিকৃতরুচির ধরে নিয়েছে। আমার চেহারা ও বেশভূষা ওর বিস্ময়ের কারণ হতে পারে।

শহরের ঠিক কোন পথ ধরে ছেলেটি হাঁটছে, আমার জানবার কথা নয়। শেষে যখন একটি নির্জনবাড়ির সামনে দাঁড়ালআরো দু-টি বাড়ি আছে বেশ খানিকটা দূরত্ব নিয়েতখন একটু হলেও নার্ভাসনেস ধরেছে। শহুরের মধ্যবিত্ত বাড়ি যেমনটা হয় তেমন একটি বাড়ি। ভেতরে আলো জ্বলছে কি জ্বলছে না, মানুষ আছে কিনা সেটা বাহির থেকে বোঝা না গেলেও বাড়িটা ঠিক ভূতুড়ে নয়। কিন্তু সঙ্গিছেলেটা কেমন ভূতুড়ে হয়ে গেল। ওকে আর দেখছি না, ওর ছায়াটাকেই দেখছি। আমাকে সদর গেটের দাঁড় করিয়ে বাড়িটা দেড়পাক ঘুরে এসে নাকিকণ্ঠে বলল, চলেন স্যার।

আমি বললাম, কোথায় যাবো? এই যে গেট বন্ধ দেখছি।

ছেলেটার ছায়া সাপের মতো শিষ দিয়ে আমার হাত ধরে টেনে বাড়ির পেছনে একটি নিমগাছের নিচে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আরো একটা ছায়া। ছায়াটি ইশারা করতেই ছেলেটি ছায়ার পিছন নিল, এই দুই ছায়ার পিছনে আমি। নিজের কাছে আমাকেও ওজনহীন ছায়াই মনে হচ্ছে। যে সিঁড়ি দিয়ে আমরা উঠছি, অন্ধকারে সেখানে হোঁচট খাবার কোন সুযোগ নেই। কারণ জোনাকির আলোর মতো একটি আলো আমার দু-পায়ের নখ বরারব উপরে উঠে আসছে। এবার উঠেই দেখি, ঐ ছেলেটি নেই। একটি বামনসাইজের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। এখানে সাতরঙের সাতটি জিরোপাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। সাতরঙের মিলিয়ে ধনুকের মতো রহস্যময় আলোয় সব কিছুকেই অন্যরকম দেখাচ্ছে। বামন সাইজের মেয়েটি দেখে বালিকা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, মেয়েটি কোনদিন-ই যুবতী হবে না। আজীবন বালিকা-ই থেকে যাবে।

এবার মেয়েটির পেছনে যাচ্ছি। হাতের দু-দিকে হোটেলের মতো রুম, রুমগুলির ভেতরে হলুদরঙের জিরোপাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। দরজা বন্ধ। একজন মানুষেরও সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ চাবুকের সপাং সপাং শব্দ আর একটি নারীকণ্ঠের গোঙানির আওয়াজের মতো কানে আসল। আওয়াজটি কোন দিক থেকে আসছে ঠিক করতে আমি দাঁড়িয়ে গেলে মেয়েটি তাড়া লাগায়, আসুন, দাঁড়াবেন না।

এতটা কৌতূহল দেখানোটা ঠিক হয়নি। এখন সত্যিই নার্ভাসনেসে ভুগছি। ভয়ও করছে ভীষণ। এইসব বেশ্যা-বারবনিতাদের নিয়ে কৌতূহল দেখিয়ে শেষে কোন ফাঁদে পড়েছি! দিনে কি সুকৌশলেই না স্যারকে শাসিয়ে আসল। লিলা করলে বালা! এখানে ওদের আসল চেহারা দেখাবে। খুন-খারাবি বাঁধবে না।

নিরামিশ জীবনে এইরকম কঠিনতার মধ্যে পড়িনি কোনদিন। নির্জনতা এত বীভৎস হতে পারে! নিশ্বাসটাও ফেলতে হচ্ছে সতর্কভাবে।

অবশেষে একটি রুমে ঢুকেছি বামনমেয়েটির পেছনে। এই রুমে জিরোপাওয়ারের একটি লালবাল্ব জ্বলছে। নিস্তেজ আলোটা চোখে এসে লাগছে। মেয়েটি কিছু না বলেই চলে গেল। এই ঘরে মৌন একটা চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। নির্জনতার চিৎকার হতে পারে। একটিমাত্র ক্যালেন্ডার ঝুলছে মাথার উপরে। তারিখগুলোতে দুই রঙের দাগ মারা। কোনটিতে লাল, কোনটিতে সবুজ। বীভৎস নির্জনতাকে এই একটি ক্যালেন্ডর-ই সমানে আঘাত করে যাচ্ছে। বিনা বাতাসেই দোল খাচ্ছে। যেন মহাকালের দেবদূত শূন্যের ওপর থেকে দোলাচ্ছে। ক্যালেন্ডারটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আরো একটি জিনিস চোখে পড়ল। চারটি চাবুক মরা সাপের মতো লম্বা হয়ে দেয়ালে সেঁটে আছে। শরীর কাঁপুনি দিয়ে ওঠে। এই কাঁপুনি শেষ না হতেই পিঠে মানুষের হাত!

আমি না, লিলাবালা-ই আমাকে ছেড়ে একটু দূরে দাঁড়াল। নির্জন ঘরে নিস্তেজ আলোতে কোন মেয়েমানুষের এতটা নিকটে এই প্রথম। আমার রুগ্ন পৌরুষত্বের পাঁজর থর থর করে কেঁপে ওঠে। আমি ভুলে যাচ্ছি অনেক কিছুই।

লিলাবালা হো হো করে হেসে ওঠে। বিদ্রƒপের হাসি না হয় ক্রোধের হাসি!  আমার শরীরের উপরে লিলাবালার শরীরের লাল ছায়া এসে পড়েছে। আমি ছায়া থেকে সরে যেতে লিলাবালা পেছনে সরে। প্রেতের মতো চেহারার এক মেয়েমানুষ ঘরে ঢুকে লিলাবালার কানে কিছু একটা বলে ক্ষিপ্রবেগে বেরিয়ে গেল। ক্ষিপ্রহাতে একটি চাবুক নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল লিলিবালা।

এ তো দেখছি নরককু-! পালাতে হবে! পালাতে হবে! আর দাঁড়ানো ঠিক হবে না! আমি নিজের উপরে সমস্ত কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছি।  নড়ার শক্তিও শরীরে অবশিষ্ট নেই। তবু পালাতে হবে। এই ভাবনাটাই শেষ। মগজ নিস্তেজ হয়ে আসছে।

যে দরজা দিয়ে ঢুকেছি ঠিক সেই দরজা দিয়ে বেরুতে পারেছি না। ঘরের ভিতরে ঘর। তবু বেরুতে হবেই। এক মানুষ পরিমাণ খোলা দরজা দিয়ে পালাতে গিয়ে যে রুমে ঢুকেছি, সেখানে ঢুকেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। জ্যামিতিক রেখার মতো নগ্নচিত্র হয়ে শুয়ে আছে এক যুবতী, চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছরের একজন পুরষের একহাতে একটি চাবুক, আর দ্বিতীয় হাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে নিস্তেজ পুরুষাঙ্গটিকে চেতাতে। মানুষটি একবার পেছনে ফিরে তাকাতেই আমার চিনতে অসুবিধা হয় না দ্বিতীয় মিটিঙে সামনের সারির একজন। এখান থেকে পালাতে গিয়ে যে রুমে ঢুকেছি, সেই রুমের দৃশ্যপট আরো অদ্ভুত! তিন যুবতীকে উলঙ্গ করে মধ্যবয়সী কালো কুৎসিত এক নগ্ন পুরুষ যার দেহ বলতে পেটটাই আসল দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে আর মুখে হাঁসফাঁস করছে। শুকনো তেঁতুলের মতো পুরুষাঙ্গ নিচে ঝুলছে। এইরকম কুৎসিত চেহারার একজন ছিলেন মিটিঙের সামনের সারিতে।

এবার পালাতে গিয়ে যে রুমটাতে ঢুকতে যাচ্ছিলাম সেখানে ঢোকা-ই গেল না। এক খর্বাকৃতির যুবক হাতে একটি পিস্তল নিয়ে ঘরের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ছায়া দেখেই ফিসফিস করে বলে, লিডার!

পালানোর পথ নেই। পিছনে ফিরতে ফিরতে সেই আগের রুমেই ফিরে এসেছি। এবার মনে হচ্ছে নরমেধের বর্বরতা আনন্দ-লোভ আমাকেও পেয়ে বসছে! দৃশ্যগুলি পুনর্বার দেখার লোভ হচ্ছে!

আঘাতপ্রাপ্ত বাঘিনীর মতো গোঙাতে গোঙাতে রুমে ঢুকে লিলাবালা। ঢুকেই ক্ষিপ্রবেগে একটি চাবুক হাতে নিয়ে ছুটে আসে আমার দিকে। বলে, নে মরদ! তুইও নে একটা চাবুক। এই শহরে একটাও মরদ নেই! সব নপুংসকের দল! এই শহরের আলো-বাতাস পর্যন্ত শালারা পেটে ঢুকিয়ে নপুংসক হয়ে গেছে। তুই নতুন আইছিস, দেখি তুই মরদ কি না? নে, তুই চাবুক হাতে নে!

লিলাবালাকে সরীসৃপের মতো দেখাচ্ছে।

লিলাবালার শরীর জুড়ে সরীসৃপ-ক্রোধ। প্রতিহিংসায় উন্মত্ত সরীসৃপের মতোই ভয়ঙ্কর কদর্য দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে হাতের চাবুক।

 

 

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ