Home > সারাদেশ > গাড়িতে গ্যাস মিলছে রাজশাহীতেই

গাড়িতে গ্যাস মিলছে রাজশাহীতেই

গাড়ির মালিক আনোয়ার হোসেন রুবেল এক সময় গ্যাস আনতে যেতেন বগুড়া, দাশুড়িয়া ও ঈশ্বরদীতে। অর্ধেক টাকার গ্যাস আসা-যাওয়াতেই ফুরিয়ে যেত। তাই প্রায়দিনই রাতের বেলায় ছুটতে হতো গ্যাস আনতে। এখন তাকে আর যেতে হচ্ছে না বগুড়া, দাশুড়িয়া ও ঈশ্বরদীতে। রাজশাহীতেই পাচ্ছেন গ্যাস।

রুবেল রাজশাহীর সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি। তিনি বলেন, দুরে থেকে গ্যাস আনতে যেয়ে নানা ঝামেলাা ও বিপাকে পড়তে হয়েছে। এমনকি ডাকাতি, ছিনতাই, মারপিট এবং খুনের মত ঘটনাও ঘটেছে। আবার সারারাত জেগে চালকরা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন আর গাড়ি নিয়ন্ত্রনে থাকে না। ফলে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। রাজশাহীতে সিএনজি স্টেশন হওয়ায় সত্যিকার অর্থে লাভই হয়েছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, এই স্টেশনটি সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়র বলে অনেকে নানা কুৎসা রটাচ্ছেন। যা হিংসাত্মক মনোভাব। স্টেশন যারই হোক আমাদের সুবিধা হচ্ছে কিনা এটা দেখার বিষয়। শিল্পে কেন গ্যাস দেয়া হচ্ছে না এটা নিয়ে খুব বেশী দেন দরবার হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। আজকে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস দিয়েছে। আগামীতে শিল্পে গ্যাস দিবে বলে আশা অনেকের।

রাজশাহীতে শিল্প কল কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলেও ৬ বছর আগে অনুমোদন পাওয়া একটি সিএনজি স্টেশনে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অনেকটা গোপনে এ সংযোগ দেন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কম্পানীর রাজশাহী অফিস। স্টেশনকে ঘিরে শুরু হয়ে গেছে অস্থায়ী দোকানপাট। সার্বিকভাবে শিল্পে গ্যাস সংযোগ না পেলেও সিএনজি স্টেশনে গ্যাস দেয়ায় ক্ষোভের চেয়ে সাধুবাদের পাল্লায় ভারি।

গ্যাস চালিত ভাড়া গাড়ি, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, গ্যাস চালিত দুর-পাল্লার বাস মালিকদের পোয়াভারি। এরকম রাজশাহী জেলাতে সিএনজি চালিত ভাড়ায় গাড়ি আছে মাত্র ১৭০টি, আর মাইক্রো-প্রাইভেট দিয়ে ২ হাজার ৫শ’র মত। তবে এখন পর্যন্ত এই স্টেশনে গ্যাসের চাপ পুরোপুরি না থাকায় কাংখিত প্রত্যাশা পূরণ এখনো অনেকদুরে। তাহেরপুরের সিএনজি চালক আশরাফুল ইসলাম বলেন এই পাম্পের গ্যাসের প্রেসার কম। এখানে ২২শ’ থেকে ২৫শ’ ঘনফুটের চাপ থাকায় গ্যাসের চেয়ে বাতাস ঢুকছে বেশী। এতে কাংখিত গ্যাস সিলিন্ডারে ঢুকছে না। গ্যাসের চাপ তিনহাজার ওপরে থাকলে কাংখিত গ্যাস সিলিন্ডারে ঢুকবে। তিনি আরো বলেন বাড়ির পাশে গ্যাসের স্টেশন হয়েছে মানেই আমাদের অনেক সাশ্রয় হচ্ছে। তবে প্রাইভেট কারের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন রাজশাহীতে গ্যাস স্টেশন হয়ে খুবই সুবিধা হয়েছে। রানিং খরচ অর্ধেকে নেমেছে।
কর্তৃপক্ষ বলছেন প্রথমে প্রথমে এরকম হয় আস্তে প্রেসার বাড়বে। নগরীর খড়খড়ি কচুয়াতৈল এলাকায় অবস্থিত নতুন ওই সেএনজি স্টেশনটি হলো সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক’র ভাই নাজমুল হকের। এই সিএনজি স্টেশনে ঘন্টায় ৬শ’ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহৃত হবে গাড়ীর জ্বালানী হিসেবে।

অথচ রাজশাহীর শিল্পখাতে গ্যাসের সংযোগ চেয়ে আবেদন করে সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করেও এখনো সংযোগ পাননি এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা অন্তত ১৪ জন। গ্যাসসংযোগ না পেয়ে তাঁদের উৎপাদনমূখী কারখানা চালু করতে পারছেন না এখনো। এ নিয়ে রাজশাহীর ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে তা না বললেও চলবে। রাজশাহীতে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়নি। এনিয়ে রাজশাহীর শিল্প-কারখানায় বরাবরের মতই স্থবিরতা বিরাজ করে। অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মতই কখনোই রাজশাহী শিল্প কল-কারখানায় এগুতে পারেনি। রাজশাহীতে গ্যাস আসার সাথে সাথে শিল্প মালিকদের আশার সঞ্চার হয়েছিল। উর্ধ্বতন দপ্তরে দেন দরবার করেও কল কারখানায় গ্যাস সরবরাহ জুটেনি। তবে রাজশাহীর শিল্পকারখার মালিকরা পরিবহন সেক্টরে গ্যাস সরবরাহকে স্বাগত জানিয়েছে। পাশাপাশি দাবি জানিয়েছেন রাজশাহীতে শিল্পকারখানাতে গ্যাস সরবরাহের।

এরই ধারাবাহিকতায় পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কম্পানী ওই সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের সংযোগ দেন। অথচ সারা দেশে অউৎপাদনশীল খাতে গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে গোপনে সরকারের অন্য কোনো সংস্থাকে না জানিয়ে ওই সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কম্পানীর রাজশাহীর ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এনবি সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সংযোগের ফাইলপত্র অনেক আগ থেকেই অনুমোদন ছিল। এ কারণে কাউকে কিছু জানানো হয়নি। আগে অনুমোদিত থাকায় সেখানে সংযোগ দেওয়ার কাজ করা হয়েছে। কোনো চাপেরমুখে ওই সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়নি দাবি করে রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, কোম্পানী থেকে সকল কাগজপত্র অনুমোদন থাকায় সেখানে সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

তাহলে টাকা জমা নেওয়ার পরেও এমনকি সকল কাজপত্র অনুমোদন থাকায় শিল্প কারখানায় কেন গ্যাসের সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এটি আমার সিদ্ধান্ত নয়, কোম্পানীর সিদ্ধান্ত। কোম্পানি আদেশ দিলে কাল বিলম্ব হবে না।

পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানী সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ৭ জুন রাজশাহীতে বাসাবাড়িতে গ্যাসসংযোগ উদ্বোধন করা হয়। এরও প্রায় বছর দুয়েক আগে অর্থাৎ ২০১১ সালে নগরীতে সিএনজি স্টেশনের জন্য আবেদনপত্র নেওয়া হয়। ওই সময় ৮ জন পেট্রোল পাম্প মালিক সিএনজি স্টেশনের জন্য আবেদন করেন। এর মধ্যে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হকের ভাই নজমুল হক ও তাঁর ভাগ্নে সিরাজুল হক বিপ্লবের মালিকানাধিন নগরীর খড়খড়ি এলাকায় এনবি ফিলিং স্টেশন’কে সিএনজি স্টেশনের জন্য অনুমতি দেয় পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানী।
রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানীর আরেকটি সূত্র জানায়, রাজশাহীতে বাসা-বাড়ির জন্য প্রায় ২১ হাজার আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। অন্যদিকে শিল্প কারখানার জন্য আবেদন জমা পড়ে মোট ১৪টি।

এর মধ্যে সাতটি কারখানায় সংযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আরো সাতটিতে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্নের পরও এখনো সংযোগ মেলেনি। এর অন্যতম কারণ হলো নতুন করে সব ধরনের গ্যাসসংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এরই মধ্যে নগরীর খড়খড়িতে নির্মিত সিএনজি স্টেশনের জন্য গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানী।

এ নিয়ে চরম চাপা ক্ষোভ আছে রাজশাহী শিল্প উদ্যোক্তাদের মাঝে। রাজশাহীর একজন শিল্প উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিল্প-কারাখানায় গ্যাসসংযোগ দেওয়া হলে অনাগ্রসর রাজশাহীকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু সেখানে সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে গ্যাস কম্পানী যানবাহনের জন্য গ্যাস অপচয় করতে সিএনজি স্টেশনে সংযোগ দিয়েছে। এটি রাজশাহীর জন্য বড় ধরনের ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত বলেও দাবি করেন ওই ব্যবসায়ী।
রাজশাহী শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে রাজশাহীতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্যাস সরবরাহ নেটওয়ার্ক নির্মাণ করেছিল, এখন তা অর্থহীন হয়ে পড়েছে। কারণ রাজশাহীতে শিল্পখাতে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধে তেমন ক্ষতি না হলেও শিল্পক্ষেত্রে গ্যাস না দেয়া রাজশাহীবাসীকে বঞ্চিত করার শামিল।

তবে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী এবং সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, রাজশাহীতে পরিবহন সেক্টরে গ্যাস দেয়াকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি তারা রাজশাহীর কলকারখানায় গ্যাস সংযোগের দাবি জানান। এমনকি বাসা বাড়ির চেয়েও কলকারখানায় গ্যাস সংযোগ জরুরী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রাজনীতিক বলেন সার্বিক অর্থে আমরা যা পাচ্ছি সেটাই স্বচ্ছ ও সুন্দরভাবে চলছে কিনা দেখার বিষয়। তিনি আরো বলেন রাজশাহী বিভাগীয় শহর হলেও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের চেয়ে বরাবরের মতই বঞ্চিত হই আমরা। এটা ব্যাথা ও দুঃখ পাওয়ার বিষয় নয়। রাজশাহীকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেই বিমাতাসুলভ আচরন করে আসছে বাংলাদেশ সরকার। এটা নতুন কিছু নয়। তবে পরিবহন সেক্টরও বিরাট সেক্টর আমাদের মনে রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন বলেন, পরিবহন সেক্টরে যেমন গ্যাস প্রয়োজন তেমনি শিল্পে গ্যাস দেয়াও অতীব জরুরী। অনেকে গ্যাসের আশায় কলকারখানা করে নাজেহাল অবস্থায় আছেন। এ ব্যাপারে সদর আসনের আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশাও সংসদে উপস্থাপন করেছেন।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ