করোনাকালে চিকিৎসাসেবার উদাহরণ ডা. হরিশঙ্কর

নেত্রকোনার মদন উপজেলার ব্যবসায়ী আজহারুল ইসলাম। অসাবধানতাবশত তার ছয় মাসের শিশুর চোখে আঘাত লাগে। কিন্তু করোনার এই সময়ে অনেক চিকিৎসক চেম্বার বন্ধ রেখেছেন, রোগী দেখছেন না। আজহারুল ইসলাম দুশ্চিন্তায় পড়েন। অবশেষে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চক্ষু চিকিৎসক হরিশঙ্কর দাসের খোঁজ পান। তাকে দেখানোর পর শিশুর চোখের সমস্যা এখন অনেকটাই দূর হয়েছে।

কৃতজ্ঞচিত্তে আজহারুল বলেন, ‘এই সময়ে ডাক্তার না পেলে হয়তো বাচ্চার চোখ চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যেত!’

সোনা মিয়া চোখের রোগী। করোনার এই দুঃসময়ে হঠাৎ চোখের সমস‌্যা বেড়ে যায়। জেলার কোথাও চক্ষু চিকিৎসক পাচ্ছিলেন না তিনি। স্বজনের পরামর্শে তিনি ডা. হরিশঙ্করের কাছ থেকে ওষুধ খেয়ে এখন ভালো আছেন।

করোনার এই ক্রান্তিকালে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ডা. হরিশঙ্কর দাস। তিনি একদিনের জন্যও রোগী দেখা বন্ধ রাখেননি। বরং তার প্রতিষ্ঠান পারমিতা চক্ষু হাসপাতালের আউটডোর, ইনডোর দুটোই চালু রেখেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে রোগী দেখছেন নিয়মিত। প্রয়োজন হলে অপারেশনও করছেন।

ডা. হরিশঙ্কর দাস বলেন, ‘চোখ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসা না করালে চোখটি চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই আমি নিয়মিত রোগী দেখছি।’

করোনার সময়ে নিরাপত্তার কারণে অনেক চিকিৎসক প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রেখেছেন। সেখানে আপনি নিয়মিত কেন রোগী দেখছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. হরিশঙ্কর দাস বলেন, ‘যুদ্ধের ময়দান থেকে কখনো কোনো সৈনিক নিরাপত্তার ভয়ে পালিয়ে আসেনি। আমি মনে করি, জাতির এই দুঃসময়ে আমাদের মানুষের পাশে থাকা উচিত। তাছাড়া, আমাদের দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংবাদকর্মীরা কেউই করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে দায়িত্ব বা চাকরি ছেড়ে যাননি। তাহলে আমরা কেন ঘরে বসে থাকবো?’

ডা. হরিশঙ্কর দাস মনে করেন, চিকিৎসকদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আরো বেশি। যদিও তিনি নিজেও পুরোপুরি সুস্থ নন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে ভুগছেন। তারপরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি। তার এই দায়িত্ববোধ প্রশংসিত হচ্ছে।

পারমিতা চক্ষু হাসপাতালের উপ-পরিচালক ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করতে ভয় পেতেন। হরিশঙ্কর দাস সবাইকে সাহস জুগিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন, এমনকি নিজ খরচে সবার সুরক্ষা সামগ্রী কিনে দিয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক আবুল কাসেম বলেন, ‘হরিশঙ্কর দাস বর্তমানে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু রোগীর সেবা বন্ধ করেননি। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং গর্বের। এই প্রজন্মের চিকিৎসকরা তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হবেন। তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।’

ডা. হরিশঙ্কর দাস পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ফ্রি রোগী দেখেন। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা কিংবা কেউ ফি দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকে তিনি বিনা পয়সায় সেবা দেন। করোনার এই সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সংবাদকর্মীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিনামূল্যে তাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ডা. হরিশঙ্কর দাস ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় ১৯৮২ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে চক্ষু চিকিৎসায় উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য ভিয়েনা যান। সেখান থেকে ফিরে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পারমিতা চক্ষু হাসপাতাল। এই হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তিনি।

%d bloggers like this: