Home > শিক্ষাঙ্গন > রাবিতে মৃত্যুমিছিল চলছেই: এরপর কে?

রাবিতে মৃত্যুমিছিল চলছেই: এরপর কে?

বিশেষ প্রতিনিধি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক সংঘঠিত হচ্ছে খুন। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্র, শিক্ষক, অবিভাবকসহ সকলের মাঝে। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতালিব হোসেন লিপুসহ গত আট বছরে ছাত্র-শিক্ষক মিলে খুন হয়েছেন ১১ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতিতে সবার মনে এখন প্রশ্ন এরপর কে?

সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর সকাল ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের পেছনের নর্দমা থেকে উদ্ধার করা হয় লিপুর লাশ। পুলিশ এবং সহপাঠীরা প্রাথমিকভাবে হত্যাকান্ড বলে ধারণা করছেন। এর আগে এবছর ২৩ এপ্রিল নগরীর শালবাগান এলাকায় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে নিজ বাসার সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী মুকুলকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এঘটনার মাত্র একদিন আগে নগরীর একটি হোটেলে নিজ কক্ষে খুন হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান।

এর আগে ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শফিউল ইসলাম লিলনকে। একই বছর ৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে নিজ কক্ষে খুন হন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মী রুস্তম আলী আকন্দ। ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল গালিব এবং সেলিম রেজা ওইসময় রুস্তমের কক্ষে অবস্থান করছিলেন বলে হলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিলেন।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা চত্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রলীগকর্মী রবিউল ইসলাম রবিকে খুন করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০১২ সালের ১৫ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে রাষ্ট্রকে সাহায্যের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি আহমেদ আলী মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন বিপুর কর্মীদের বন্দুকযুদ্ধে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগ কর্মী আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেল নিহত হন।

২০১০ সালের ১৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী উদযাপন ও খাবার টোকেন বিতরণকে কেন্দ্র করে দলীয় কর্মীরা মারধর করেন ছাত্রলীগকর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে। পরে তাকে হলের দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে ফেলে দেন। ৯ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়ে ২৩ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। একই বছর ৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রশিবির। পরে তার লাশ শাহ মখদুম হলের সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেয়। এ ঘটনার পরে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিবির কর্মী হাফিজুর রহমান শাহীন। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ছাত্রলীগ, শিবির ও বিনোদপুরের ব্যবসায়ীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষের পর ছাত্রীগকর্মীদের হাতে খুন হন তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী।

এদিকে লিপু হত্যাকান্ডসহ গত আটবছরে যে ১১জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী খুন হয়েছেন তাদের কোন ঘটনারই এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। বিচারহীনতার এই সংষ্কৃতির কারণেই হত্যাকান্ড বাড়ছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত এমন শিক্ষক-শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অবিভাবকরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে বলেন, ‘নিয়মিত এমন ঘটনায় আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। অধিকাংশ হত্যার ঘটনার কোন শাস্তি আমরা আজও দেখতে পাইনি। এমন চলতে থাকলে হত্যাকারীরা আরো উৎসাহিত হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যদি প্রতিটি হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং শাস্তি দেয়া হয় তবে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। এমন হত্যাকান্ড চলার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রেও কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরে লিপুসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক হত্যার ঘটনা দেখলাম। এমন ঘটনায় পরিবার আতঙ্কিত। আমরা নিজেরাও ভয়ের মধ্যে থাকি। বাবা-মা তো সারাদিনে কয়েকবার ফোন দিচ্ছে। এখন শুধু ভয় হয়, এরপর আবার কাকে যে খুন করা হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমানের বাবা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছি শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এমন হত্যাকান্ডের খবর দেখে আতঙ্কিত বোধ করছি। না জানি কখন আমার ছেলের সাথে এমন ঘটনা ঘটে। আজকাল তো খুন একদম সস্তা হয়ে গেছে। প্রশাসন এবং সরকারের এ বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। নইলে শুধু পরবর্তী খুনের অপেক্ষায় থাকতে হবে।’

এদিকে লিপুর হত্যাকান্ডের পর ক্যাম্পাসে কিছুটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে। এরই মধ্যে আগামী ২৪ তারিখ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মুজিবুল হক আজাদ খান।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ