Home > ধর্ম ও জীবন > বদরের যুদ্ধ ও সুমহান শিক্ষা

বদরের যুদ্ধ ও সুমহান শিক্ষা

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজান। মোমিন মুসলমানদের জন্য এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত রহমতুল্লিল আলামিন হজরত মোহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর নবুয়াত ও রিসালাতের ঘোষণা প্রকাশ হয় এই রমজান মাসে। ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয় এ মাসেই। দ্বিতীয় হিজরি তথা হিজরতের দ্বিতীয় বছর রমজান মাসের ১৭ তারিখ এ যুদ্ধ হয় মদিনা হতে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৮০ মাইল দূরে বদর উপত্যকায়।

বদর যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিমরা সংখ্যায় অনেক কম হয়েও মক্কার কাফির শক্তিকে পরাজিত করে ইসলামের স্বর্নোজ্জল সূচনার সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সূচিত হয়ে যায়। এজন্য এই যুদ্ধকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী বলা হয়। আল-কোরআনে এই দিনকে ইয়াওমূল ফুরক্বান বলা হয়। রাসূল (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের মাত্র দেড় বছর পরের ঘটনা এটি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কুরাইশরা রাসূলকে (সা.) মদিনা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য নানারকম অপচেষ্টা চালায়।

বদরের যুদ্ধ ছিল ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করেন এবং কাফেররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কুরাইশদের আক্রমণ ঠেকাতে যেয়েই এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেন বিশ্বনবি হযরত মোহাম্মদ (সা.), তাঁর চাচা হজরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং হজরত আলি (রা.)। আর মুশরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেয় আবু জেহেল (আমর ইবনে হিশাম) এবং আবু সুফিয়ান।

মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। আর মক্কার কাফির মুশরিক কুরাইশ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল এক হাজার। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ও অস্ত্রবল মক্কার কাফির মুশরিক কুরাইশদের থেকে অনেক কম থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ জাল্লাশানুহুর অশেষ রহমতে মুসলিম বাহিনী বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল। এই বিজয় ইসলামের সুদূরপ্রসারী বিজয়ের দ্বার উন্মোচিত করে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন কুরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে : বদর প্রান্তরে যখন তোমরা হীনবল ছিলে রাব্বুল আলামিনই তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। (সূরা আল ইমরান : আয়াত ১২৩)।

এ যুদ্ধে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়। ১৪ জন সাহাবি শহীদ হন। তাঁদের ১৩ জনের কবর এবং নামফলক বদর প্রান্তরে সংরক্ষিত রয়েছে। আর একজন সাহাবি আহত অবস্থায় মদিনার ফেরার পথে কিছুদূর আসার পর শাহাদত বরণ করেন। সেখানেই তাঁর সমাধি হয়। এ যুদ্ধে মুসলমানদের কেউ বন্দি হননি।

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে রাসূল (সা.) আল্লাহর দরবারে বার বার দোয়া করছিলেন : হে আল্লাহ্ ! তুমি আমার সঙ্গে যে ওয়াদা করেছো তা পূর্ণ করো, হে রাব্বুল আলামিন আজ যদি এই মুষ্টিমেয় লোকের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত তোমার ইবাদত করবার কেউ থাকবে না। কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে : স্মরণ করো, তোমরা তোমাদের রবের নিকট সাহায্যের জন্য দোয়া করেছিলে। তিনি তা কবুল করেন এবং বলেন : আমি তোমাদের সাহায্য করবো সহস্র ফেরেশতা দ্বারা যারা একের পর এক আসবে। (সূরা আন্ ফাল : আয়াত ৯)।

এ যুদ্ধ ছিল মুসলিম মুহাজিরদের জন্য ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা। কারণ, সদ্য ছেড়ে আসা তাদের আপন রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে ছিল এ যুদ্ধ। ঈমানের পরীক্ষায় তারা জয় লাভ করেছিল। এ সকল মুহাজির নিজের আত্মীয়-স্বজনদের পরিহার করে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকেই বেশি ভালোবেসে ছিলেন। যার প্রমাণও তারা দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক বদর প্রান্তরে অনুষ্ঠিত ‍যুদ্ধের ময়দানে।

বদর যুদ্ধের পর নবীজির (সা.) অবস্থান ছিল পরাজিত আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা না করা ও কষ্ট না দেওয়া। যুদ্ধ শেষে নবীজি (সা.) প্রথম ঘোষণা করলেন: ‘তাদের হত্যা কোরো না।’ বদরের বন্দিদের প্রতি রাসূল (সা.) যে আদর্শ ব্যবহার দেখালেন, জগতের ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। তাঁর আদেশে মদিনায় আনসার এবং মুহাজিররা সাধ্যানুসারে বন্দিদেরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে আপন আপন গৃহে স্থান দিলেন এবং আত্মীয়-স্বজনের মতোই তাদের সঙ্গে করেন। বন্দীদের স্বগতোক্তি ছিল—‘মদিনাবাসীদের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হোক। তারা আমাদের উটে চড়তে দিয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে গেছে, নিজেরা শুষ্ক খেজুর খেয়ে আমাদের রুটি খেতে দিয়েছে। (বিশ্বনবী, গোলাম মোস্তফা)।

ইসলাম এবং মুসলমানের জন্য এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বদর যুদ্ধ। ইসলাম যে শিক্ষা মুসলমানদের প্রতিনিয়ত দিয়ে আসছে তা হলো- সব কাজে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ভরসা। বিপদ-আপদসহ সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর আস্থাশীল হওয়াই হলো বদরের ঐতিহাসিক সুমহান শিক্ষা। রাব্বুল আলামিন বদর প্রান্তরের এ সুমহান শিক্ষাকে মুসলিম উম্মাহর জীবনের প্রতিটি কাজে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। -আমিন।

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Translate »
শিরোনামঃ