Home > অন্যান্য > নিঃসঙ্গ এক প্রবাসীর গল্প !

নিঃসঙ্গ এক প্রবাসীর গল্প !

১৯৯৫সালে সিংগাপুরের আসলাম.আমাদের পরিবারে ৫বোন আর ৫ ভাই ছিলাম.আমি ছিলাম সবার ছোট.বাবাকে হারিয়েছি ছোট কালেই.ভাই বোনেরা যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত । আমি থাকতাম বোনের সংসারে, বোনই টাকা দিয়ে আমাকে সিংগাপুরে পাঠিয়েছে। আমি ও বোনের মর্যাদা সব সময় রেখেছি.বিদেশের সব টাকা বোনের নামে পাঠাতাম।

আমার ভাগ্য ভাল ছিল অনেক টাকা বেতন পেতাম। অল্প দিনে বোনের ঋন শোধ করে ফেললাম.কয়েক বছরে অনেক রোজগার করলাম .একদিন বোনকে বললাম দেশে এসে বিয়ে করবো তাই আমার জন্য বাড়ি ঘর তৈরী করতে, সেই জন্য বোনকে অনেক টাকা দিলাম। আমি বোনকে অনেক বিশ্বাস করতাম। একসময় বোন বললো দেশে যেতে বাড়ি ঘর সব ঠিক করে ফেলেছি। আমিও ২০ভরি স্বর্ণ কিনে দেশে গেলাম। গিয়ে দেখলাম সবকিছু ঠিকঠাক, বিয়ে হয়ে গেল অল্প দিনে। বিয়ে এক সাপ্তাহ পর বোন এসে বললো আমার স্বর্ণ গুলো দিতে ওদের বাড়িতে রাখবে নিরাপদে। আমি ও কোন কিছু না ভেবে দিয়ে দিলাম। এর পরে দিন বোন ও বোন জামাইসহ কয়েকজন লোক এসে আমাকে বললো আগামি সাপ্তাহ বাড়ি থেকে চলে যেতে ।

আমি অবাক হয়ে বোনকে জিজ্ঞাসা করলাম ওনারা কি বলছে? বোন বললে ওরা ঠিকই বলছে এই বাড়ি তোর নামে না তোর দুলাভাইয়ের নামে। আমি বললাম তাহলে আমার বাড়ি কোথায়? তখন দুলাভাই বললো সেটা আমরা কিভাবে বলবো। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না বোনের কথা গুলো শুনে। যাকে এত বিশ্বাস করতাম সেই বোন আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকা করবে।এই নিয়ে অনেক মারামারি হলো বোন। দুলাভাই ও ভাগিনাগের সাথে। অনেক মার ও খেলাম ওদের কাছ থেকে। অবশেষে গ্রামের সালিশে ৫লক্ষ টাকা দিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। অনেক অনুরোধ করলাম তবুও স্বর্ণ গুলো ফেরত দিল না।

ভাগ্য নিয়তি মনে চলে এলাম ঐ বাড়ি থেকে। নতুন করে বাড়ি কিনে বউকে শ্বশুর বাড়ি রেখে চলে এলাম সিংগাপুরে। সিংগাপুরে আসার পর ভাগ্য যেন আরো নির্মম নিষ্টুর হয়ে গেল। কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল, আমিসহ আরো ২০ বাঙ্গালী পারমিট বাতিল করে দিয়ে দেশে ফেরত পাঠাল। দেশে গিয়ে ছোট্ট একটি ঘর তুলে সংসার শুরু করলাম। কয়েক বছর পর ঋন করে দুবাই গেলাম। সেখানে ভাগ্য আমাকে নিয়ে খেলতে শুরু করলো। একদিন কাজ আছে তো ৩দিন নেই.তবু ও কষ্ট করে কাটিয়ে দিলাম কয়েক বছর। সেখানে বাঙ্গালী বাঙ্গালী ঝগড়ার কারনে রুমের সব বাঙ্গালীকে দেশে পাঠিয়ে দিল। দেশে এসে ইটভাটা কাজ করতে লাগলাম।

এদিকে একটি ছেলে সন্তানের আশায় আশায় ৪ মেয়ে হয়ে গেল.সংসারের অভাবের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলাম আমি। কথায় আছে না ভাগ্য যার শত্রু তার তখন পি্রয় মানুষগুলো হয় আরো ভয়ংকর.আমি বাহিরে আর বউ অন্য বাড়িতে কাজ করতো তবুও অভাবে সাথে যুদ্ধ করে পারি নাই। বার বার পরাজিত হয়ে নিভে গেল জীবনে সুখগুলো। মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবার ঋন করে সিংগাপুর আসলাম। সিংগাপুরের এসে বছর কাটিয়ে দিলাম ২টি শার্ট প্যান্ট দিয়ে। কখন ভাল কিছু খেয়ে দেখেনি.KFC সিংগাপুরের জনপ্রিয় খাবার অনেক চেয়ে ছিলাম খেতে কিন্ত খাইনি কখন টাকার জন্য।

আমার চালচলন ছিল একটু ভিন্ন কারন আমিতো জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিক। পৃথিবীর মানুষগুলো বড়ই স্বার্থপর পরাজিত মানুষের পাশে কেউ থাকে না। কেউ জানতে চাই না জীবনের গহীনে লুকিয়ে থাকা ব্যর্থ গল্প। ২বেলায় খেয়ে কাটিয়ে দিলাম দিনের পর দিন। রুমে সবাই আমাকে নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলতো। অনেক তিরস্কার করতে। রুমের মানুষের কথা গুলো শুনে একা একা কাঁদতাম। নিজেকে তখন ছোট মনে হত যখন নিজের ছেলে বয়সের ছেলেরা বলত আমি নাকি পতিতালয়ের বাসিন্দা তাই বাড়ি যাই না। শত অপমান সহ্য করে রুমে থাকতাম নিজের জীবনে পরাজিত কথা মনে করে আর কোন জামেলায় জড়াতে চাইনি। ৪বছর পর একটি ছেলে সন্তানের আশায় আবার ছুটিতে বাড়ি গেলাম। আবারও নিরাশ হলাম বিধাতার দয়া মেয়ে হলো.আমার ব্যর্থ জীবনে আর একটি পরাজয় মনে নিলাম ভাগ্য দোষ বলে। এদিকে সমাজের মানুষের অপমানে আর কটু কথা বউ অপরেশন করে আসলো যাতে আর সন্তান না হয় আমি ও না করিনি.এখন আমার জীবনে কোন আশা নেই, আর কোন সুখ চাই না। একটা ছেলে সন্তান চেয়ে ছিলাম শেষ বয়সে আমার আর আমার দুখীনি বউ দেখবে বলে। এখন ভাবি আল্লাহ যেন আমাকে আরো শক্তি দেয় যেন কাজ করে মেয়েগুলোকে বিয়ে দিতে পারি।

যদি দেহ আগের মত শক্তি পাই না। বয়সের ভারে খুব ক্লান্তি লাগে। অল্পতে হাপিয়ে উঠি। খুব কষ্ট হয় যখন প্রচন্ড রোদে কাজ করতে হয়। কিন্তু আমার এখনো তো অনেক কাজ বাকি মেয়েগুলোকে বিয়ে দিতে হবে। তাই সব কষ্ট মেনে নিয়ে মনের শক্তিতে কাজ করতে হয়। এখন আল্লাহ কাছে একটা চাওয়া যেন মেয়েগুলো ভাল ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারি। এখন আমার দুই মেয়ে বিয়ে উপযুক্ত। এক মেয়ে বিয়ের টাকা রোজগার করতে ২বছর চলে যায়। জানি না আর কত বছর প্রবাসে থাকতে হবে আর যাওয়ার ইচ্ছে ও নেই। টাকা রোজগার করে মেয়েগুলোকে ভাল বাড়িতে ও ভাল ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারলে এই ব্যর্থ জীবনটা একটু স্বার্থক হত। এখন নিজেকে নিয়ে খুব ভয় হয় যখন বাড়ি যাবো শেষ সময়টা যে আরো যন্তানায় কাটাতে হবে। আমাদের দুজনকে দেখার কেউ থাকবে না মেয়ে গুলো বিয়ে হয়ে গেল তাদের সংসার নিয়ে থাকবে। হয়তো বাবা মা কে ওদের দেখতে ইচ্ছে করবে কিন্তু মেয়েদের সংসার নিজের সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তখন চাইলে ওদের সময় থাকবে না। কারন নিজের সংসার আর সন্তান থেকে আপন কেউ হয় না এটা যে চরম বাস্তব।

মাঝে মাঝে বউকে বলি মেয়েদের বিয়ে তুমি আর আমি হারিয়ে যাবে সাদা মেঘের ভেলায় করে অচিন দেশে। যখন আমার বউটা বলে আমি যদি তোমার আগে চলে যাই ওপার। তখন তোমার যে খুব কষ্ট হবে। একা একা থাকতে পারবে।তখন আর নিজেকে সামলাতে পারি না ও দু-চোখের পানি আটকিয়ে রাখতে পারি না। একা কাঁদি কেউ আমার কান্না শুনে না আমি ছাড়া। বিধাতাকে বলে আমরা দুজন এক সাথে চলে যেতে পারি ওপারে। এখন সিংগাপুর আমি একা আমার কোন বন্ধু নেই। রবিবারে কাজ না থাকলে শনিবার রাতে আমার প্রিয় একটি জায়গা চাইনিজ গার্ডেন বসে থাকি। সামনে একটি ছোট নদী তার ওপারে চির সবুজ গলফ মাঠ রাতে আঁধারে নিরব এক পরিবেশ। নিজের ব্যর্থ জীবনে গল্পগুলো মনে করে অনেক কাঁদি। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে রাত ৩টা বাজে বুঝতে পারি না। বার বার একটা কথা মনে পরে কাঁদি কেন আমার জীবনটা এমন হলো। কি অপরাধ করছি যার কারনে জীবনের শেষ বয়সে প্রবাসে একা একা কাঁদতে হয়। বিশ্বাস করাটা কি অপরাধ ছিল। রাতের আঁধারে বিধাতার কাছে চিৎকার করে বলি আমি কেন আজ এ ধরাতে দুখী মানুষ.আমি আর আমার বউয়ের যখন মরণ হবে তখন আমার লাশ টা কাধে নেওয়ার সময় আমার সন্তান থাকবে না। অপরের কাঁধে চরে যেতে হবে ওপরারে। মরণে পরে যে কেউ রইলো না ঘরে প্রদীপ জ্বালানো। মেয়েরা পরে থাকবে শ্বশুরবাড়িতে এটা আমাদের সমাজের নিয়ম এটা যে চরম সত্য ও বাস্তব ।

যদি একজন প্রবাসী পড়ে তবু সকল প্রবাসী ভাইদের অনুরোধ করে বলি নিজের জন্য কিছু টাকা জমাতে। যদি ১০হাজার টাকা বেতন পান সেখান থেকে (১)হাজার টাকা জমা করুন এর একটা মনে রাখবেন প্রত্যেক মাসে নিজেদের জন্য অল্প কিছু টাকা জমা করবেন। তাই বলে এই না যে পরিবারের কথা ভুলে গেছেন। কাউকে বেশী বিশ্বাস করবেন না নয়তো আমার মত জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে । যদি আমার বোন বেইমানি না করতো তাহলে আমার জীবনটা এমন হত না। আমি চায় না কোন প্রবাসীর জীবন আমার মত হোক।
#সংগ্রহীত

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Translate »
শিরোনামঃ