Home > সাহিত্য ও সংস্কৃতি > মার্কা : মঈন শেখ

মার্কা : মঈন শেখ

ত নষ্টের গোড়া ঐ ফতে বুড়ি। তার কাছে ভোট চাওয়াটাই ঠিক হয়নি। বলরাম জিতেছে ২৭ ভোটে। সে ভোট না দিলে একটা ভোট না হয় কমই হত। প্রতিপক্ষের একটা বাড়তো। তাতে কি, তার জিত কেউ ঠেকাতে পারত না। আর ভোটকর্মীরাও বলিহারি, তাকে অত সাধবারই বা কী ছিল? অমন একটা আধ পাগলী মানুষকে বুঝাতে গেছে ভোট নেবার জন্যে। তাতেও ঠিক ছিল, কিন্তু মার্কা অত করে বিশ্লেষণ  করবারই বা কী এমন দরকার ছিল? এখন যা হবার তাই হল। বলরামের বাপ-মায়ের দেয়া সাধের নাম ভুলে এখন ফতে বুড়ির দেয়া নামেই ডাকবে সবাই। কারণ, বলরাম চেনে জহির ঢেঁকি আর হুঁক্কাবাবুকে। শ্রীমতি সুমতি রাণির দশাটাও সে জানে। যদিও দ্বিতীয় দফায় জিতে সে অনেকটা উদ্ধার পেয়েছিল। জহির ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ফেল করলো। মার্কা ছিলো ঢেঁকি। হেরে গেল জহির, কিন্তু থেকে গেল ঢেঁকি। আমৃত্যু তাকে জহির ঢেঁকি বলেই সবাই চিনলো। অবশ্য এখন তার ছেলেমেয়েদের কোন কোন বৃদ্ধ জহির ঢেঁকির বেটা-বেটি বলেও ডাকে। অনাথ বাবুর মার্কা ছিল হুঁকা। সেও হারলো। তবে অমন এক সম্মানীয় ব্যক্তির নামটা আর উঁচুতে থাকলো না; ধেন্দুর খেল। নামের সাথে না গেলেও, নাম পেল হুঁক্কা বাবু। আর নির্বাচনী মিছিলের কথা বলাই বাহুল্য।  যখন সামনে থেকে একজন বলে উঠতো, ভোট দিবেন কিসে? অমনি পেছন থেকে সমস্বরে একযোগে বলে উঠতো- হুঁক্কাতে হুঁক্কাতে। ভোট দিবেন কীসে?- হুঁক্কাতে হুঁক্কাতে। ঐ মিছিলে তরুণ বলরামও ছিলো। ডাকসাইটে বেচারা অনাথ বাবু। নিরবে ঠিক অনাথের মত এদিক ওদিক চাইতো। সে শুধু মিছিলের ঢঙে ডান হাতটা ওঠাতো আর নামাতো, মুখে কিছু বলতো না।শ্রীমতি সুমতি রাণি মহিলা কাউন্সিলরে দাঁড়ালো দোয়াত-কলম নিয়ে। শিক্ষিত স্বামী কিনু সরকার বউটার প্রতি খুব খুশি হয়েছিল এমন একটি প্রতীক বেছে নেবার জন্য। বউয়ের পিঠ চাপড়িয়ে বলেছিল- তুমি লেখা-পড়া না জানলে কী হবে সনেকার মা, মার্কা কিন্তু নিয়েছ জব্বর। এতে হারলেও আমার দুঃখ থাকবে না।তবে কিনু সরকারের দুঃখ হার-জিত পর্যন্ত  পৌঁছায়নি। তার আগেই দুঃখ পেতে হয়েছিল।প্রথম দিন মিছিলে সব ঠিকঠাক ছিল। সবাই যখন সমস্বরে বলতো দোয়াত কলম, দোয়াত-কলম; তখন বুকটা ভরে যেত সুমতির, বুক ভরতো কিনু সরকারের। মিছিলের সামনে থাকা ব্যক্তি যখন বলতো- তোমার মার্কা; পেছন থেকে সবাই বলত- দোয়াত-কলম। সামনে বলতো- আমার মার্কা; পেছনে বলতো- দোয়াত-কলম। সামনে বলতো- জিতবেই তো; পেছনে বলতো- দোয়াত-কলম। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটলো দ্বিতীয় দিন থেকে। মিছিলে কিনু সরকার খেয়াল করলো, সামনের জন ঠিকঠাক বললেও কেমন জানি পেছনজনেরা অন্যকথা কলছে। ভালো করে কান পেতে শুনে থমকে গেল কিনু। একি! কার সাথে কলমকে চালাচ্ছে? দোয়াতের ‘দ’ -এর জায়গায় ‘দ’ যে আর নেই। আরও দুই লাইন টপকে ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম লাইন থেকে তাদের পছন্দের যুতসই একটা বর্ণ বেছে নিয়েছে। এতে সম্মান হানী হল কলমের। কারণ, দোয়াত আর দোয়াত হয়ে নেই। সুমতি ঠিক লাফিয়ে চলে মিছিলের সাথে। অবশ্য সুমতির মতি কোনদিনই সু হয়নি। উল্টোপাল্টা কাজ সে চিরদিনই করেছে। আজও করলো। উপভোগ করছে বিষয়টা। সামনে সুমতি  লাফিয়ে চলে। লাফাতে পারলো না কিনু। নিরবে হেঁটে চলে তাদের সাথে। তাদের সাথে ডান হাতটা শুধু তালে তালে উপরে উঠছে। এতে করে  মিছিলে প্রদত্ত দোয়াতের প্রতিশব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিতে লাগলো। ধরণী দ্বিধাবিভক্ত হলে কিনুর জন্য সুবিধা হয়। সেইবার পাশ করলো না সুমতি। তবে হাল ছাড়বার মেয়ে সে নয়। পাঁচ বছর পর ঠিক দাঁড়িয়ে গেল নির্বাচনের খুঁটি ধরে। এবার কিনু সরকার বারবার সতর্ক করেছে সুমতিকে। এবার দোয়াত-কলম নয়। দোয়াত-কলম না ছাড়লে আমার ঘর তোকে নির্ঘাত ছাড়তে হবে। সুমতির সুমতি এক্ষেত্রে হয়েছিল। হাজার কথা না শুনলেও শুনেছিল এ কথা। কারণ দোয়াত-কলম তাকে অনেক দিন ভুগিয়েছে। হারবার পর এখনো তার প্রতিপক্ষ অর্থাৎ যারা জিতেছিল, তাদের সমর্থকরা অনেকেই তাকে দেখতে পেলে আড়াল থেকে দোয়াত-কলমকে ঘুরিয়ে টুপ করে কথাটা বলে ফেলে। এবার সেটা মোচনের পালা। যেভাবেই হোক, জিততে হবে। এবার মার্কা নিলো গোলাপ ফুল। তার ইচ্ছা, গোলাপ ফুল নিয়ে জিতে আবার সেই ফুলের বিজয়মালা গলায় পরে সারা গ্রাম ঘুরবে। মার্কাটি নিয়ে যখন সুমতি বাড়িতে এলো, তখন তার হাতে গোলাপই ছিল। গোলাপটা কিনুর হাতে দিয়ে বলেছিল- এই নাও তোমার মার্কা। কিনু কিছু বলেনি, বরং খানিক থেমে থেকে মুচকি হেসেছিল।যা হবার তাই হল। কিনুর মুচকি হাসির তাৎপর্য কড়ায়গ-ায় ফলে গেল। এবার আর দ্বিতীয় দিন গড়ালো না। প্রথম দিনেই মিছিল ভিন্নমাত্রা পেল। লোকও হল প্রচুর। শুধু বদলে গেল শ্লোগান। সামনে থেকে যখনই বলছে- সবাই বল, পেছন থেকে একসাথে বলছে- ‘ঐ’ ফুল। গতবার দোয়াতের স্থানে যে শব্দ এসেছিল, এবার গোলাপের প্রতিশব্দ হল ‘ঐ’ শব্দ। সামনে থেকে বলে- তোমার মার্কা; পেছন থেকে বলে- ‘ঐ’ ফুল। সামনে থেকে বলে- আমার মার্কা; পেছন থেকে বলে- ঐ ফুল। অর্থাৎ এবার গোলাপের ‘গ’ শুধু ঠিক থাকলো, বদলে গেল ‘ল’ আর ‘প’ এর গড়ন। উচ্চারণ হল ভিন্নভাবে।নিজেকে আর আটকাতে পারল না কিনু। সেই রাতেই মাথাতে আগুন চড়লো। বউয়ের চুল ধরে দু ঘা বসিয়ে দিলো ঘাঁই ঘাঁই করে।- মাগী, তুই আর মার্কা পেলি না। সেবার নিলি দোয়াত-কলম; মানুষ বলল ওতে কলম। এবার নিলি গোলাপ ফুল; মানুষ বলছে ওতে ফুল। ক্যারে মাগী দুনিয়াত আর মার্কা নাই। হাঁপাতে হাঁপাতে একটু দম নিলো কিনু। একটু থেমে আবার বলল- আপেল, কাঁচি, নিতি।- তা নিলেই মুনে হয় রক্ষা পেতি মিনশে। তোর নাঙ্গেরা আপেল কাঁচি দিয়েই তোর শ্রাদ্ধ করতো।কুঁচোতে বসা মুরগিকে জোর করে তুলে দিলে যেভাবে খেঁকিয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবে ঝনঝনিয়ে উঠলো সুমতি। একথা অবশ্য ঠিক। মানুষের দুর্বল জায়গাতে সবাই হাত দেয়। মানবধর্ম বলে কথা। দুর্বল হয়ে থাকা মানুষের দুর্বল জায়গারও অভাব হয় না কোনদিন। অবশেষে কিনুও সেটা বুঝলো। সেই রাতের মত থামলো দুজনে। অবশ্য এমনটি আর হয়নি পরে। সেবার জিতেও ছিল সুমতি। কিন্তু দোয়াত-কলম আর গোলাপ ফুল ভুগিয়েছে অনেকদিন।
এলাকাতে একটা কথা প্রচলিত আছে, ফতেবুড়ি যাকে ভোট দিবে সে নির্ঘাত জিতে যাবে। সেই ক্ষেত্রে ফতেবুড়ির ভোট পাবার জন্য সবাই তোড়জোর করে কমবেশি। বুড়ির আর একটা গুণ হল, সে ভুলেও কোন প্রার্থীর টাকা পয়সা ছুঁবে না। গতবার বলরাম ফতের ভোটটা নিতে পারেনি। অল্প ভোটে হেরেছে। ভোট না পাবার  আর একটা কারণ হল, তার মার্কা। মার্কা ছিলো ফাইল কেবিনেট। ফাইল কেবিনেট জিনিসটা বলরাম নিজেও ভালো চিনতো না। নির্বাচন কমিশনের উদারতায় চিনেছে। এই মার্কা গোটা গ্রামশুদ্ধ ধরে ধরে চেনাতে আর বুঝাতে হয়েছে। বয়স্ক লোকেরা বুঝতেই চান না, ফাইল কেবিনেট একটা মার্কা হতে পারে। দু একজন জানতেও চেয়েছে, এটা খাবার জিনিস না পরবার। ফতেবুড়িকে কোনভাবেই বুঝানো যায় না মার্কার মাহাত্ম। বুড়ির সাফ কথা, মিনশে তোমরা মার্কা পাওনা দুনিয়াতে। ক্যান, তোমরা মই, আম, হাঁস কিংবা মুরগী নিতে পার না? বুড়িকে কোনভাবেই বোঝানো যায় না, এতে তাদের কোন হাত নেই। নির্বাচন কমিশনের চোখে এগুলো না ধরলে তাদের কিছুই করবার থাকে না। বলরাম বুড়ির ভোট পায়নি; পেলো তাহের দাওয়ানের ডালিম। পাাশও করলো তাহের।বলরাম এবার মার্কা নির্বাচনে খুব সতর্ক ছিল। কিছুটা লাইন ঘাটও করেছিল তার ইচ্ছামত মার্কা নেবার জন্য। কিন্তু পছন্দ হয় না। সবই তার অপছন্দের। ব্লাকবোর্ড কিছুটা পছন্দ হল তো রঙটা হলো বাধা। তাতে লেখা অ ই ঈ। তাতেও ক্ষতি খুব একটা নেই। পড়তে না পারলেও বোর্ডটা বুঝতে পারলেই চলবে। কিন্তু মার্কার যে সর্বাঙ্গই কালো, সিল মারবে কোথায়? বোর্ড কৃষ্ণঠাকুর নন, আর ভোট গণবেন যারা, তারাও রাধা বা গোপিনী নন, যে কালোর ওপরে কালো দেখে খুশিতে নাচবেন। পাঞ্জাবিও তাই। ব্রিজ কিছুটা পছন্দের তালিকায় ছিলো। কিন্তু নমুনা ছবিটা মোটেও ঢঙে ঠেকেনি বলরামের চোখে। একটা ব্রীজের যতটুকু অংশের ছবি নমুনাতে ছিল, দেখে মনে হচ্ছে মরা তোলা খাটলি। এই মার্কা নিয়ে জিতলে ভালো, আর হারলে বলরাম আর বলরাম থাকবে না, সেই খাটলির গুণে নির্ঘাত ‘বলহরি’ হয়ে যাবে। বলহরি বলেই ডাকবে সবাই। অবশেষে মার্কা নিতে হল উটপাখি। হোক অচেনা, মানুষ না হয় বালিহাঁস ভেবেই ভোট দেবে। এমনটাই ভাবলো বলরাম।এবার বলরামের প্রথম থেকেই টার্গেট, ফতেবুড়ির ভোটটা তার লাগবে। লোকও সেট করেছে সেভাবেই। কিন্তু ফতেবুড়ি বুঝতে চায় না উটপাখি আবার কেমন পাখি। যদিও কম্পিউটারম্যানের পা-িত্বের বহরের গুণে পোস্টারে ছাপা হয়েছিল ‘উঠপাখি’। এ নিয়ে সমস্যা হয়নি। উটপাখি আর উঠপাখি আলাদা করে বোঝাবার মানুষ তারা নয়। সমস্যা হয়েছিল প্রতীক নিয়ে। ফতেও বুঝতে চায় না, এটা আবার কোন দেশের পাখি। এযে একেবারে শোগনি গো। সবাই তাকে বোঝায়, না দাদি এটা শকুন হবে কেন, এটা উটপাখি। বিদেশি পাখি। খুব দামি পাখি।- বিদেশি পাখি তো এদেশে কেন? মিনশে দেখতো, আমার বাঁশঝাড়ে কত পাখি। আমার দেশে কি পাখির কমতি পড়েছে। উটপাখির দেশেও বোধহয় এত পাখি নেই।ফতেবুড়ির যুক্তি এড়িয়ে যেতে পারে না উটপাখির সমর্থক। অবশেষে নাজেহাল হয়ে বলে, – ঠিক আছে দাদি, তুমি না হয় বালিহাঁস মনেকরেই দয়া করে ভোটটা দিও। এই তোমার পায়ে ধরছি।- হ্যাঁরে মিনশে, কত টাকা খেয়েছিস বলোর? আর তোদের বিদেশি এই শোগনি মার্কা পাখিকে আমি বালিহাঁস বলতে যাব কেন? আমাকে বালিহাঁস চেনাস। দেখতো আমার উঠানের হাঁসগুলো। কত সুন্দর আর চকচকে। উঠানে বসে থাকা হাঁস চারটি দেখিয়ে দিলো বুড়ি। থতমত খেয়ে গেল তার কাছে বসে থাকা চারজন। শেষতক নিরুপায় হয়ে বলে ফেলল- ঠিক আছে দাদি, হল শকুন। তুমি শকুন মনে করেই একটা ভোট দিও। বুড়ির হাত চেপে ধরলো একজন। বুড়ি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। ফোকলা গালেও যে এমন ঝনমনিয়ে হাসি হয়, তা বুড়ির হাসি দেখলে আর শুনলে বিশ্বাস করা যায়।- বাহ্ ভালই তো, ভিনদেশী দামি পাখি নিলি আর শোগনী হয়ে পাশ করবি। বাহ্। আরও এক ঝলক হেসে নিলো বুড়ি।- দাদি তোমাকে কথা দিতে হবে, উটপাখিকে, না না শকুনকে ভোটটা তুমি দিবে। আবার হাতটা চেপে ধরলো লোকটি। সে ভালো করেই জানে, ফতেবুড়ি একবার কথা দিলে সে কথার নড়চড় হবে না। কোন প্রলোভনে সে ভুলবে না।- যাহ্ শালা, শোগনীকে একটা ভোট দিবো। বুড়ি ফোকলা গাল দুটো ফুলালো হাসবার ঢঙে। তবে উপস্থিত আর সব স্বস্থির ঢেকুর তুললো। তারা বুড়ির হাসিতে হেসে বিদায় নিলো।এবার পাশ করলো বলরাম। তবে ফতেবুড়ির জন্যে বলরাম আর বলরাম রইলো না। সে হয়ে হলে শোগনী মেম্বার। ফতে গোলটা বাধিয়েছিল প্রথমেই। ভোটকেন্দ্রে যে বুথে ছাপ মারবে বুড়ি, সেখানে নাকি আলোর স্বল্পতা ছিলো। বুড়ি নিজে ছাপ মারতে পারেনি। তাই একজন সহযোগিকে নিয়েছিল। বুথের মধ্যেই সে নাকি চিল্লিয়ে বলেছিল, শোগনীকে একটা ছাপ দিতে। সাহায্যকারী যতই বলে- শোগনী বলে কোন মার্কা নেই; বুড়ি ততই বলে আছে। অবশেষে বুড়ি চিল্লিয়ে বলে, বলরামের মার্কা রো বলোরামের। বলোর শোগনীকেই ভোটটা দে। ঐ ঘরের সহকারি প্রিজাইডিং, পোলিং অফিসার ও পোলিং এজেন্ট, আনসার সহ সবাই হোহো করে হেসেছিল। এমন কি ফতে যখন ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরছিল তখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকান থেকে কে একজন ভোট দেবার কথা জিজ্ঞাসা করলে সে অন্য দুই মার্কার সাথে এও বলেছিল- শোগনীকে ভোট দিয়েছি। কথাটা  সেদিনের কিংবা পরের দিনের কিংবা তার পরের দিনের বাতাসের দ্বিগুণ গতিতে ছড়িয়ে পড়লো চারদিক। বলো মেম্বার হয়ে হলে শোগনী মেম্বার। ফতেবুড়িকে খুন করতে ইচ্ছা করলো বলরামের। আবার মনে সান্ত¦না আনে, হোক শোগনী, তবে তো মেম্বার; শোগনী মেম্বার।আজকে বলরামের মেজাজটা বেশ ফুরফুরে। গতরাতে টিভিতে একটা অনুষ্ঠান দেখেছে। জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটা শকুনকে নিয়ে। শকুনের অনেক গুণের কথা শুনেছে সে। পরিবেশবাদীরা বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণী টিকিয়ে রাখবার জন্যে অনেক চেষ্টা করছে। মানুষকে সচেতন করছে এই বিষয়ে। শকুন যে মানুষের বন্ধু, প্রকৃতির বন্ধু, সেটাই ঘুরেফিরে এসেছে তাদের কথায়। শকুন তাড়ানো শৈশব বলরাম স্পষ্ট দেখতে পেল। মরা গরু কীভাবে পরীক্ষা করে সর্দার শকুন, তাও দেখতে পেল মেম্বার। শকুনকে তাড়াতে তাড়াতে মাঠের মধ্যিখানে নিয়ে যাওয়া যায়, লেজ প্রায় ছোঁয়া যায় কিন্তু ধরা যায় না। সেই শকুন আর নেই। নিজেকে ভালোলাগতে লাগলো মেম্বারের। তার আর মনে হচ্ছে না, সে একটা ইতর প্রাণীর সাথে মিলানো মেম্বার। এমন ফুরফুরে মন নিয়ে শীতের সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে হাঁটছিল মেম্বার। এক চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সেখান থেকে এক বৃদ্ধ ডাক দিলো – শোগনী মেম্বার, চা খেয়ে যাও।বলোরাম মুচকি হেসে সুড়সুড় করে বৃদ্ধের পাশে গিয়ে বসলো। তার যাবার ঢঙ দেখে মনে হলো, সে এই ডাকটার জন্যে অপেক্ষা করছিল। স্টলের সবাই বলোর এই হাস্যজ্জ্বল মুখ দেখে অবাক। সেখানে দুজন শিক্ষকও ছিলো; একজন প্রাইমারীর আর একজন হাইস্কুলের। বলো নিজেও তাদের ছাত্র। হাইস্কুলের শিক্ষক বললেন- বলরাম, আমাদের এলাকা থেকে শকুন হারিয়ে গেলেও নামটা কিন্তু থেকে গেল। অনেকদিন তোমাকে মনে রাখবে মানুষ। স্টলের সবাই হাসলো। কেউ শব্দ করে কেউ আস্তে। বলোর মুখেও হাসি। আজ বলোর আচরণ সবার কাছেই উল্টো ঠেকছে। প্রাইমারীর শিক্ষক বললেন-  বলোরাম, তুমি রাগ করো না। যারা তোমাকে রাগাবার জন্য বলছে তারা জানে না, শকুন কত উপকারী প্রাণী। আমরা দোয়া করি তোমার মধ্যে উপকারী শকুন-সত্ত্বা যেন জাগ্রত হয়। শকুন প্রকৃতির বন্ধু আর তুমি হবে মানুষের বন্ধু। কথাটা শুনে দু একজন হাসলেও মাথা ঝোঁকালো সবাই। মাথা ঝোঁকালো মেম্বারও। মেম্বার শুধু ছোট করে বলল- দোয়া করবেন স্যার। চায়ের কাপে আরও একবার চুমুক দিতে দিতে ভাবল- আমি শোগনী নামেই খ্যাত হতে চাই। যে মেম্বারকে এর আগে দ্যাখেনি মানুষ। আর গতরাতের প্রকৃতি ও জীবন বিষয়ক অনুষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি মুকিত মজুমদার বাবুর সাথে যদি কখনো দেখা হয়, তখন সে নিজেকে পরিচয় দিবে শকুন বলে। তিনি নিশ্চয় বুকে জড়িয়ে ধরবেন আমাকে। এমনই ভাবতে ভাবতে কাপে শেষ চুমুকটা দিলো। আর উঠবার সময় ঐ বৃদ্ধকে অর্থাৎ যে বৃদ্ধ তাকে ডেকেছিল চায়ের জন্য, তাকে ইশারায় বলল, চায়ের দামটা দিয়ে দিতে। সবাই আরও একবার হেসে উঠলো। তবে বলোর জন্যে নয়, বৃদ্ধের কাবু হওয়া দেখে। যে সারা জীবন মানুষের টাকায়  চা খায়, সে বিপদে পড়ে আজ চায়ের দাম দিচ্ছে। তাও আবার বলো মেম্বারের অর্থাৎ শকুনী মেম্বারের চায়ের দাম।বলোরাম সবাইকে প্রণাম জানিয়ে উঠে দাঁড়ালো। স্টলের নিচে নামতেই হাইস্কুলের শিক্ষক গলা উঁচিয়ে বলল- বলোরাম, তুমি শকুনী-মেম্বার হয়েই থেক, শকুনীমামা হইও না যেন। আরও এবকার হাসলো সবাই। হাসলো শকুনী-মেম্বারও। তবে হাসির সাথে সম্মতিসূচক মাথা হেলানোর ঢঙও ছিল। #বৃষ্টিকুসুমমঈন শেখ
ওহেদ দাওয়ানকে এই অসময়ে মসজিদের বারান্দায় দেখে কেউ অবাক হয়নি। অবাক হয়নি তার ওজু করে টুপি পরা দেখে। কারণ এমন কর্ম এখন গোটা গ্রাম জুড়েই হচ্ছে। হিন্দুপাড়া থেকে শঙ্খধ্বনিও ভেসে আসছে বারবার। ওহেদ শুকরিয়া আদায়ের জন্য দুই রাকাত নামাজ পড়বে। পশ্চিমপাড়া থেকেও এলো দুইজন। আজ আকাশে মেঘ দেখা গেছে।গুনেগুনে চারমাস তিনদিন হল, বৃষ্টির ফোটা পড়েনি জমিনে। মেঘ যে আকাশে দেখা গেছে এমনও বলা যায় না। বৃষ্টি যা হবার তা হয়েছিল অসময়ে। চৈত-বোশেখ মাসে। কিন্তু এরপর আর হয়নি। এই সময় কিংবা এমন লম্বা সময় টানা খরানি দ্যাখেনি কেউ। মোড়ে মোড়ে এমনই আলোচনা হত প্রথম দিকে। তবে এখন ঘর থেকে লোকজন যেন বের হওয়া ভুলে গেছে। কুড়ি-গাবাড়ি, খাড়ি-বিল শুকিয়ে একাকার। ফেটে চৌচির। পুকুরও জীর্ণশীর্ণ। তলানিতে পানি। আগাম বর্ষণে যা একটু জমেছিল, তাও শুকিয়ে গেছে। ধারে কাছের বিছনে পানি দিতে দিতে এই অবস্থা। এভাবেই কোন রকমে জিইয়ে রেখেছিল বিছন। এখন পুকুরওয়ালা বেঁকে বসেছে। এভাবে পানি তুলতে দিলে কাদা ছাড়া কিছু থাকবে না। মানুষও হাল ছেড়ে দিয়েছে।  বিছন বাঁচিয়ে রেখে কী হবে; পুঁতবে কোথায়? ভুঁই যে ফাটা কাঠ।আজ হঠাৎ করে গড়মড়িয়ে মেঘ ডেকে উঠলো। নিমিষেই ছেয়ে গেল পশ্চিমের আকাশ। বাতাসের গতিও বেড়েছে দ্বিগুণ। থেকে থেকে তাতে লতাপাতা আর ধূলোবালির ঘূর্ণি। থাক বালি, থাক ঘূর্ণি; তবুও ঘর থেকে বাহিরে এসেছে সবাই। চোখে বালি পড়লে পড়–ক, বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে নিবে সব। সে আশাতেই যেন সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তাছাড়া এমনিতেও চোখে কম ধূলো জমেনি আগে। সেটিও ধুবে আজ। চোখের পাতা, মুখের চামড়া অনেকেরই পুড়ে গেছে খরানির ঝাঁলে। খোলা মাঠের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কীভাবে আগুন জ্বলে। বরেন্দ্রর লালমাটি যেন সত্যিই আগুনে-লাল। বড়বড় আলের ধার ঘেঁষে আগুনের ঝলকানি আরও বেশি। ধিকিধিকি জ্বলে।আকুবুড়ি এর মাঝেও বাড়ির বারান্দায় বসে থাকে। হাত ধরে টানলেও ঘরে যায় না। খড়ের একটা আঁটি টেনে নিয়ে ঠিক বসে থাকে; এক ধেয়ানে তাকিয়ে থাকে ভাটাময় ধোঁয়াসে মাঠের দিকে। পলক ফেলে না। আর ফেলবার মত পলকইবা কোথায়। পলকের পালক সব ঝরে গেছে অনেক আগেই। বুড়ি দ্যাখে সারি সারি চিতা জ্বলছে। কোনটি কার, সেটিও সে বিড়বিড় করে বলে। আরও দূরে, আরও উঁচু আড়ানির গা ঘেঁষে চিতাটা নাকি তার। বিড়বিড় করে বলে, তার নাকি খড়ি কম লাগবে। তার সাথের যারা গেল তারা গেল কিন্তু যারা গেল না তাদেরকেও আর বাঁচিয়ে রাখে না আকু। ঠিক শুইয়ে দেয় ধারে কাছের কোন চিতাতে।আকুবুড়ির বয়স নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। কেউ বলে ১০০, কেউ বলে ১১০ আবার কেউ বলে ১২০। তবে ১০০ বছরের নিচে কেউ বলেনি কোনদিন। অনেকদিন ধরে এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বুড়ি। আরও ২০ বছর বাঁচলেও বোধহয় ১২০ টপকাবে না। এরমধ্যে কয়েকবার যমের সাথে ধ্বস্তাধস্তি করেছে বুড়ি, নিতে পারেনি। তুলসিতলায় নামাবার আয়োজন হতেই হঠাৎ নড়ে উঠে বুড়ি। নামানো আর হয় না। কেউ কেউ হতাশও হয়। এখন নিজে নড়বার বড় একটা শক্তিও নেই। ঘরেও থাকবে না বুড়ি।  পাঁজা করে তুলে কাউকে না কাউকে বাইরের বারান্দায় রেখে যেতে হবে। আগুনের ঝাঁঝেই শরীর পোড়ায় বুড়ি। অনেকে কাছে গিয়ে বলে- কত্তা, ঘরে যাও। ঝাঁটিতে দেহ পুড়ে যাবে। গালের আকাঁবাঁকা রেখাগুলোতে মিথ্যে হাসিরে আবছা ছায়া ফেলে বলে- খরানির ঝাল কি আর মারবেরে বাছা, এর চেয়ে পানির ঝাঁঝ আরও বেশি। মরলে পানির ঝাঁঝেই মরব। এমন এলোমেলো কথা বুড়ির নতুন নয়। তার এমন কথাতে কেউ আর আমল দেয় না। হাসেও না। সোজা চলে যায়। যেন বলার জন্যেই সে কিছু বলে গেল। কিন্তু আকু বুড়ি ঠিক হাসে। হাসি তার মুখে ফুটে উঠুক আর না উঠুক। তবে ভালো করে দেখলে, মানে দেখার চোখ হলে, বুড়ির ঐ মুহূর্তের মুখকে রেনেলের আঁকা নদনদীর একটা ছোটখাটো মানচিত্র মনে হতে পারে। কত নদী ছিল, কত নদী মরে গেছে, কত নদী গতিপথ হারিয়েছে, কোন নদীর উৎপত্তি কোথায় ছিল, তা যেন যে কোন নদী গবেষক আতশ কাঁচ ছাড়ায় বলে দেবে। কপীল ভট্টাচার্যতো বটেই।আজ আকু বুড়ি বের হয়নি। যখন সবাই ঘর থেকে বের হল, তখন আকু বুড়ি ঘরে। সমস্ত গ্রাম জুড়ে শোরগোল। বন্যায় হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গ্রাম ভাসালেও বোধহয় এত গোল হত না। ছেলে বুড়ো সবাই গ্রামের বাইরে। মাঠে। শুধু এ গ্রাম কেন, সমস্ত বরিণের এই কোণাটার পুরো এলাকা জুড়ে এখন হইচই। মেঘ এখন পুরো আকাশ জুড়ে। প্রথমে গোড়ার দিকে সিঁদুরে ছিল; এখন তা অনেকটা কেটে গেছে। এটা নাকি শুভ লক্ষণ। মেঘের গর্জন তখনও কেউ শুনেনি। যার কারণে পুচকে ছোঁড়ারা কেউ বলতেও পারছে না, যত গর্জে তত বর্ষে না। তবে মানুষের উচ্ছাস, উদ্বেগ আর আগ্রহ দেখে প্রবীণ দু চারজন বলে বসলো- তুরা অত লাফালাফি করিস না; আল¬া নারাজ হোবে। দোয়া পড়, কালেমা পড়।অবশেষে বৃষ্টি নামলো। দড়মড়িয়ে গড়মড়িয়ে আর সবকিছু ছাপিয়ে। এতদিন ধরে পোড়া মাটি হলেও অল্পতেই গলে গেল। জমিনেরও যেন অভিমান চলছিল আসমানের সাথে।  দীর্ঘদিন পর আজ অভিমান ভাঙলো।  বড় সোহগী হয়ে উঠলো বরেন্দ্রর মিশ্রিত লালমাটি। মনে হল, প্রতিক্ষিত বৃষ্টির আলিঙ্গনে পথ-ঘাট আরও লজ্জাবতী সেজে লাল হয়ে উঠলো। বৃষ্টি আর বৃষ্টি। ধুয়ে যায় রং, তবু ফুরায় না রং । পাশের ডোবা বা পুকুরে গড়িয়ে পড়ে পানি। পুকুরও হয়ে ওঠে ঘোলাটে লাল। এই বরিনের মাটিতে এত রং এত লজ্জা আর এত আবির, এর আগে কখনও দ্যাখেনি মানুষ। নাকি একেই বলে মাটির ঋতুবতী হওয়া। বড় ব্যবধানে হওয়া বলেই কি এত রং।গ্রাম এখন প্রায় শূন্য। কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছাড়া সবাই মাঠে। কোদাল খুন্তি, যে যা পেরেছে তাই নিয়ে ছুটেছে মাঠে। পানি আটকাতে হবে। যতই আল টপকাক, খানিক পরে ঠিক পালাবে ফাটা ফুটো বা গোঙ্গাল দিয়ে। ফাটা বুঁজাতে হবে, আল বাঁধতে হবে, ইঁদুরের গর্ত কুপিয়ে গোবর-কচা দিতে হবে। বরেন্দ্রর এই তানোর, বিশেষ করে পশ্চিম ধারের জমিনগুলো বড় বৈচিত্র্যময়। জমি ধাপে ধাপে ওপরে ওঠা, আবার ধাপে ধাপে নিচের দিকে নামা। দেখে মনে হবে পৃথিবীর কোন এক প্রাচীন জনপদের বৃহত্তম জাঙ্গাল ছিল এটি। এখন কালের চাকার ঘঁষাতে ঘঁষাতে এ অবস্থায় দাঁড়ানো। এক সময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল এই বরেন্দ্র। শক্ত বাহুর সাঁওতালরা যা আবাদ যোগ্য করেছে। মানুষ অতসব জানে না, বা জানতেও চায় না। তারা জানে এ মাটি অভিমানী। বৃষ্টি নামলেই দৌড়াতে হবে তার কাছে। না হলে কখনই সে রসিক হবে না। বরিনের এ এক অন্য রূপ। শুকালে ইটের ঝামা। বেভাগে পা পড়লে রক্ত বের না করে ছাড়ে না। আবার পানি পড়লে ঠিক জামবাক মলম। বৃষ্টি আর মাটি, প্রেমিক যুগলের মত। দুরত্ব বাড়লে অভিমানের শেষ নেই। মিলে গেলে একাকার।সবাই ব্যস্ত কোদাল তোলা আর ফেলাতে। যা শব্দ তা বৃষ্টির আর কোদালের ওঠা-নামার। নিঃশ্বাসের ফেলা তোলার শব্দও কম নয়। তবে বৃষ্টির ঝাপটানীর সাথে পেরে উঠছে না। আর এর মাঝেই খবরটা এলো। হাত উঁচিয়ে দোড়াতে দোড়াতে কে একজন বলছে কথাটা। মাটির দিকে চোখ নেই; চোখ তার সামনে বা আরও দূরের ব্যস্ত মানুষগুলোর দিকে। পা পিছলে পড়েও গেল কয়েকবার। তাড়াহুড়ো  করে উঠে প্রতিবার যেভাবে দৌড় দিলো, যেন পড়েনি সে, পড়বার ভাণ করেছিল মাত্র। খবরটা কানে যেতেই থমকে গেল সবাই। যাদের কোদাল মাটির মধ্যে পুঁতে ছিল, তারা তা তুললো না। যাদের কোদাল ওপরে উঠে ছিল, তারা তা নামালো না। তবে শঙ্কিত হল মনে মনে। তারা শুনতে পেল- মকসেদকে পাওয়া গেছে গো, মকসেদকে পাওয়া গেছে। এক বৃদ্ধ হাজার শব্দের সাথে পাল¬া দিয়ে হাত উঁচিয়ে বলল- তা কুনঠে দেখলা গো?-তালান্দর হাটে, রামবিলাসের দোকানের বারান্দায়।আর কোন কথা হল না সংবাদদাতার সাথে। সে সামনে দৌড়ালো। তবে কর্মরত মানুষগুলোর কাজ থেমে গেল। কেউ কেউ ওপর দিকে তাকিয়ে আল¬ার কাছাকাছি গিয়ে বলল- আল¬া তুমি দয়া কর, বৃষ্টি থামিও না।বৃষ্টি থামলো না, তবে বৃষ্টি ভেজা মানুষগুলো থামলো। যে কারণে থামলো, সেই কারণের তরজমা করতে এখন সময় নিচ্ছে তারা।
মকসেদ কোন দিনই এতটা পরিচিত নাম ছিল না। ধারে কাছের বা গ্রামের যারা চিনতো, তারা মকো বলেই চিনতো। আর বাপ মা যত দিন ডেকেছে , তা বড়জোর মুকসেদ। মকসেদ নামটা তার গ্রামে, ভিন গ্রামে বা তার পরের গ্রামে ছড়ালো ঘটনাটা ঘটবার পরে। তবে শালিসে বিচার হবার পর তা আর এ গ্রাম ও গ্রাম থাকেনি; সারা থানা জুড়ে রটে গেল তাদের কথা। বিশেষ করে মকসেদের কথা। মকসেদ চিরদিনই ঝিমধরা ছেলে। দশ কথা পাড়লে এক কথার উত্তর। অথচ কাজে খুব পটু। কামলা হিসাবে তার সুনাম আছে। সব গেরস্ত তাকে নিয়ে টানাটানি করে। সহজ সরল হলেও কাজ বুঝে ষোলআনা। ফাঁকি দেয় না একতিল। সেই আলাভোলা মকসেদ এমন একটা কা- ঘটাবে কেউ অনুমানে আনেনি। সেই মকসেদ দড়াম করে ভালোবেসে ফেললো কুসুমকে। বাপ মায়ের কাছে গোঁ ধরলো, তাকে বিয়ে করবে বলে। বিয়ে না দিলে নিজেকে শেষ করবে, এমন হুমকিও দিলো। সবার স্নেহের আর ভালোবাসার মুকসেদ বিয়ে করবে, এতে সবার খুশি হবার কথা ছিল। চাঁদা তুলে, পুকুরওয়ালার পুকুরের বড় মাথার মাছ দিয়ে বড় খানার আয়োজন করবার কথা ছিলো। কিন্তু তা হল না। সবাই তাকে দূরদূর করলো। কেউ লাঠি নিয়ে মারতে গেল। যারা তাকে খুব ভালোবাসতো, তাদের কেউ কেউ বলল- শালাকে জিন্দা পুঁতে ফেলো।মকসেদ ভালোবাসলো কুসুমকে। কুসুমও মকসেদকে। কিন্তু এরকম ভালোবাসা এর আগে কখনো দেখেনি কেউ। অন্তত এই পাড়াগাঁয়ে তো বটেই। দুই বাড়িতে দুজনের হুমকি। ওখানে কুসুম বলে, বিয়ে না হলে মরবে; আর এখানে বলে মকসেদ। মকসেদের মাও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মকসেদ বিয়ে থেকে ফিরে না এলে সে নিজেই ফাঁস দিবে। মেয়ের সংসার তাকে টেকাতে হবে। ধর্ম-আগুন লাগবে যে। পাপে গিরশে যাবে গোটা সংসার। ভাগনী বলে কথা। হোক বোনের সতীনের মেয়ে। তার বাপ তো একটাই। বোনের স্বামী।বোনের বাড়িতে প্রথম দিকে যেত না মকসেদ। বলতে গেলে কয়েক বছর। বোনের উপর রাগ নয়, রাগ তার বাপ-মায়ের ওপর। একমাত্র বোনকে বিয়ে দিলো সতীনের ঘরে। মেয়ের নামে দুবিঘে জমি লিখে দিতে চাইলো আর অমনি গলে গেলো তারা। বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের চার বছর পার হলো। বোন মালেকার ছেলের বয়সও হল প্রায় তিন বছর। আর ঐ ছেলের লোভেই একদিন গেলো মকসেদ। সে থেকে আর কমতি নেই যাওয়া আসায়। বোন, বোনের সতীন, ভগ্নীপতি, বোনের সতীনের মেয়ে, সবাই ভালোবাসে মকসেদকে। বরং যেতে খানিক দেরি হলে ডেকে পাঠায় তারা। বাড়ির ছেলে মেয়ে মামা বলতেই অজ্ঞান। একসাথে খায় একসাথে ঘুমায়। বোনের সতীনের মেয়ে যে ছোট আছে, তাও নয়। কিন্তু মামা তো। কেউ ভাবেনি সেই মামা, সেই ভাগনী অর্থাৎ মকসেদ আর কুসুম তাদের সম্পর্ক টপকাবে।মা প্রথমে অবাক হলেও খুশি হয় মনেমনে। ছেলে তার আগের চেয়ে চনমনে হয়েছে এটা ঠিক, তাই বলে বাপের সামনে এমন একটা কথা বলতে পারবে, ভাবতে পারেনি।  তবে খুশি হয়েছে, ছেলে তার বিয়ে করবে। রাতে খাবার শেষে দুম করে বলে ফেলল কথাটা- মা আমি বিয়ে করবো।স্বামী-স্ত্রী কথা বলল না। দুজন দুজনার দিকে শুধু তাকালো একবার। রাতের অন্ধকারের সাথে তাদের নিরবতাও কিছুক্ষণের জন্যে এক হয়ে থাকলো। আবার মকসেদই সেই নিরবতা ভাঙলো- কইরে মা কিছু বুলিস না যে?- আচ্ছা বিয়ে করবি সেতো ভালো কথা। তা তাড়াহুড়ো কীসের? বিয়ে বললেই তো বিয়ে নয়? বউ আগে খুঁজি, তোর দুলাভাইকে ডাকি।-  আবার দুলাভাই কেন, তুমরাই বিয়ে দাও?- খ্যানরে বাপ, তুর দুলাভাইয়ের ওপর এখন আবার কীসের রাগ? তাছাড়া একটাই জামাই।- তুমার জামাইকে বুললে বিয়া দিবে না। তুমরাই দাও।- ক্যা তুর পছন্দ আছে নাকি? এবার বাপ প্রশ্ন করলো।- হুঁ। মাথা নিচু করে সংক্ষেপে বলল মকসেদ।- আচ্ছা, তুই যাকে পছন্দ করিস তারা রাজি থাকলে, আমরাও রাজি। দরকার হলে তোর দুলাভাইকে আমরাই রাজি করাবো।- তুমরা খালি দুলাভাইকে টানছো কেন বল তো? যার দুলাভাই নাই, তার কি বিয়া হয় না? মাথায় যেন রক্ত উঠলো মকসেদের। থমকে গেল তার বাপ-মা। কিন্তু তারা ভেবে পেল না, জামাইয়ের ওপর নতুন করে আবার কীসের রাগ জমলো।- তা জামাইকে ডাকলে তোর সমস্যা কোথা? বাপও কিছুটা রেগে গেল।- আছে। আমি কুসুমকে বিয়ে করবো।থমকে গেল বাপ; থমকে গেল মা। শরীরের শিরা উপশিরাগুলো ফুলে উঠলো। রক্তের গতি আর চাপ তাকে যেন ছিঁড়ে ফেলেেব। মায়ের মাথায় এ চিন্তাও এলো, ছেলেকে তার দু বছর আগেও অনেকে পাগলা বলে ক্ষেপাতো। কিন্তু এখনতো মকসেদ দিব্যি চনমনে। তবে কি এটা নতুন করে পাগল হবার উপসর্গ । নাকি পাগল হয়েই গেল। কিন্তু বাপ অতকিছু ভাবতে পারলো না। দোড়ে গিয়ে খপ করে ছেলের কবজি চেপে দরলো।- এই হারামজাদা, কী বললি, বল আর একবার?- যা বলেছি তাই। কুসুমকেই বিয়ে করবো।কথাটা বোধহয় শেষ করতে দিলো না। শেষ হবার আগেই বাঁশ ফাটানো দুটি শব্দ হল মাত্র। দু গালে দু থাপ্পর এত জোরে পড়লো, যে ঘরও কাঁপলো। কেউ বিশ্বাস করবে না ষাট উর্ধ্ব মানুষটার গায়ে এত জোর। মাও ভয় পেয়ে এক ধাপ পিছে সরে গেলো। তবে মকসেদ সরলো না, রাগ দেখালো না, গড়মড়িয়ে বাপের পা জড়িয়ে ধরলো। হাউমাউ করে ডুকরে উঠে বলল- আব্বা, আমাক খুন করো; আর বেঁচে থুইলে আমার কুসুমকে এনে দাও। আমাকে ছাড়া কুসুমও বাঁচবে না আব্বা। আবার নতুন করে চমকে উঠলো বাপ-মা। ছেলের গোছালো কথা বলা শুনে আর দৃঢ়তা দেখে। তার পরেও বলতে গেলে জোর করে একটা লাথি মারতে গেল সেরাজ। তবে লাথিটা যত জোরে ছেলেকে লাগলো, তার উল্টো গতিতে সে পেছনে পড়ে গেলো। থরথর করে কাঁপছে সেরাজ। বউ সখেনা তুলতে গেলে তাকেও ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো। এবার মুখ খুললো সখেনা- ওই হারামী, কুসুম যে তোর ভাগনী হয়রে। ও কথা যে মুখে আনাও পাপরে হারামী।- কুসুম আমার ভাগনী হবে কেন? সে তো কুসুম। সে তো বোনের সতীনের মেয়ে।- ওরে হারামীরে, সেকি তোকে ভাই বলে? মামা বলে ডাকে। বোনের সতীন, সেও তো তোর বোন। তোর ভাগনে শরীফের সে যে আপন বোন।- ও মা, তুমি যেই হিসাব করছো, তাতে দুনিয়ায় তো আদম আর হাওয়া ছাড়া কেউ থাকতো না। আমি হিসাব ধর্ম বুঝি না। আমার কুসুমকে এনে দাও।- ও অল¬া, তুমি মাফ কর। এই শুয়োর, একবার থামেক। আল্লার গজব নামবে। ধ্বংস হবি হারামি। ও অল¬াগো, তুমি কোন হারামী আমার পেটে দিয়াছিলা গো?তিনজনে মিলে ঐ বিষয়ে আর নতুন কথা হল না। যা হল, তা হইচই। সেরাজ একবার লাফ দিয়ে উঠতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। চিৎ হয়ে পড়ে গেলো। মা চিল্লিয়ে উঠলো – তুই বাপকে না খেয়ে থামবিনারে হারামি। এই প্রেসারের মানুষটাকে বাঁচাবো কী করে? মা দোড়াদোড়ি করতে লাগলো, স্বামীর মাথায় পানি ঢালবার জন্যে।তিন প্রাণির সেই রাতে কীভাবে কাটলো, তারাও বলতে পারবে না। একমাত্র জানে রাত আর রাতের অন্ধকার। দীর্ঘশ্বাস, অল্পশ্বাস আর মিছে মশা তাড়াবার মধ্যে দিয়ে সেই রাত কাটলেও পরের রাত একটা দুর্যোগের মত মনে হল মকসেদের কাছে। তবে এমন যে হবে, সে আগেই জানতো। কারণ, গতরাতের মত ঘটনা কুসুমের বাড়িতেও ঘটেছে। তার মাত্রা কতদূর বা কুসুমের গায়ে কতটা ক্ষতচিহ্ন এরমধ্যে অঙ্কিত হয়েছে, সে খবর এখনও সে পায়নি। তবে দুর্যোগ একটা নির্ঘাত নেমেছিল তাদের বাড়িতে। আজ নামলো এই বাড়িতে।মকসেদ পালাতে পারতো, পালায়নি। বরং গোটা দিনে প্রস্তুতি নিয়েছে মোকাবেলার। বোন-ভগ্নিপতী একসাথে এসেছে। অনেককিছু ঘটে গেল সেই রাতে। বিশ্রিভাষায় গালাগালি হল, বেধড়ক মার হল, সেরাজের মাথাতে প্রেসার ওঠাতে পানিও ঢালা হল। সেই রাতের কাহিনী একসাথে বলা সম্ভব নয়। আরব্য উপন্যাসের মত চলমান থেকেই যাবে।  শেষ কথা হল, মকসেদ সেদিন কোন উচ্চবাচ্য করেনি; শুধু মার খেয়ে গেছে আর বাপ-মা, বোন-ভগ্নিপতীর পা ধরে গড়াগড়ি করেছে। তার কথা ছিল একটাই- কুসুমকে আমাকে দাও। আমরা দেশান্তরি হব। যেখানে কেউ দেখবে না, সেখানে ঘর করবো। কুসুম আমার, আমি কুসুমের। মারের চোটে জ্ঞান হারাবার আগেও বিড়বিড় করে সে এভাবেই বলছিল। তবে পাকা সিদ্ধান্ত যা হল, তা মকসেদের জ্ঞান হারাবার পর।সাতদিনের মাথায় বিয়ে হল কুসুমের। পাশের গ্রামের রফিকের সাথে। রফিকের পরিবার এর আগে দুবার প্রস্তাব দিয়েছিল, রাজি হয়নি কুসুমের পরিবার। এখন বলতে গেলে মেয়ে পক্ষ ছেলে পক্ষকে ডেকে বিয়ে দিলো। মহাখুশি রফিক। মনেমনে পছন্দ করতো কুসুমকে। সে নিজেও ভাবেনি, অত সহজে তার ভালোবাসার মানুষকে পাবে। কুসুমের উপায় ছিলো না। উপায় রাখেনি; না শরীরের না মনের। অন্যদিকে মকসেদ হল নিরুদ্দেশ। বাপ মা কিছুদিন বলল, আপদ বিদেয় হয়েছে। ভাবল, খালি গোয়াল সেই ভালো। আবার ভাবলো, কদিন বোঁ বোঁ করে ঘুরে  ঠিক ফিরে আসবে, মানুষের লাত্থি ঝাঁটা খেয়ে। কিন্তু দিন সপ্তাহ এমনকি মাসও গেল। মকসেদ এলো না। মায়ের ছিনাল মন গুমরে কাঁদে। গোপনে তা আঁচলে আড়াল করে; স্বামীর চোখ বাঁচিয়ে।ভূত দেখার মত চমকে উঠলো সখেনা। চোখের ঝাপসা ভাব তখনো কাটেনি। সবে ঘুম থেকে উঠেছে। ফজরের নামাজের জন্য উঠে ওজুর বদনাটা বারান্দা থেকে নিয়ে মাথা তুলতেই দেখতে পেল। চোখদুটো একবার ডলে নিলো ঘোর কাটাবার জন্যে। না, এটা চোখের ঘোর নয়, মনেরও নয়। এটা পুরো সকাল হবার আগে ঝাপসা আলোর ঘোর। ঠিক চিনেছে। মকসেদ দাঁড়িয়ে। বদনাটা হাত থেকে খসে পড়লো। ছুটে গেল ছেলের কাছে। জড়িয়ে কাঁদতে লাগলো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। – বাপ, মনে পড়লো আমাদের? বাপ-মা কি ছেলের খারাপ চায়? তুই কখন এলি? ডাকিসনি তো? রাত থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস? মা ধরেই নিলো ছেলে মাঝরাতে এসে ডাকতে সাহস পায়নি। মশার কামড় খেয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আসমানের নিচে। গড়গড় করে আরও প্রশ্ন করে চলে মা, আর হাত দিয়ে সমস্ত পিঠে বুকে কী যেন হাতড়াই। হয়তো সেদিনের পিটনীর ক্ষতচিহ্নের দাগ। মা অস্থির হলেও ছেলে ঠিক দাঁড়িয়ে। এখনও কোন উত্তর দেয় না। অবশেষে মা ইশারায় বলে, বাপ তোর ঘরে যা। তোর বাপ এখনো উঠেনি। নামাজ শেষে তোকে খেতে দিচ্ছি। মকসেদ কতটা শুকিয়েছে তা দেখবার জন্যে মুখের দিকে একবার তাকালো। আর ঠিক তখনই পেছনে কার ছায়া অনুভব করলো। মকসেদের বাপ দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয়বার চমকালো সখেনা। ছেলে ঘরে ঢুকলো, মা পড়ে থাকা বদনাটা দ্রুত তুলে নিলো। বদনা পড়বার শব্দেই মনে হয় সেরাজ উঠে এসেছিল। হয়তো তখন থেকেই দাঁড়িয়ে সে; মা-ছেলের কা- দেখছিল। সেরাজও দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে পুকুর ঘাটের দিকে গেল, তার ভেজা চোখটা যেন অন্যকেউ দেকতে না পায়।এবারের খবরটা এলো যতটা দুঃসংবাদ হয়ে, ঠিক ততটাই হল বিস্ময়ের। খবরটা এলা সকাল দশটা নাগাদ। মেয়ে শরিফাকে এত সকালে দেখে সেরাজ ও সখেনা যতটা অবাক হল, তার হাজার গুণ বেশি অবাক হয়ে শরিফা আকাশ থেকে পড়লো ভাই মকসেদকে বারান্দায় দাঁতন করতে দেখে। যার উপর দুনিয়ার খিস্তি খেউড় করতে করতে  এলো, সেই মকসেদকে এখানে দেখবে ভাবতে পারেনি।  ধপ করে উঁচু বারান্দায় বসে পড়লো, নিচে পা ঝুলিয়ে। কী বলবে আর কী করবে তাই-ই ভাবতে কিছুটা সময় নিচ্ছে হয়তো। নাকি আকাশে চমকানো বিজলী আর গর্জনের মাঝের ফাঁক এটা। ভাই মকসেদ এগিয়ে আসলো না। মা আর বাপ এগিয়ে এলো দুদিক থেকে। তারা কাছে আসতেই দুজনারই দুই হাত ঝাপটে ধরলো শরিফা। উঠে দাঁড়াবার শক্তি পাবার জন্যেই বোধহয় ধরলো। তিড়িক করে দাঁড়ালেও বাপ মাকে কোন প্রশ্ন করবার সুযোগ দিলো না, হিড়হিড় করে দুজনকে টেনে নিয়ে গেল ঘরে। এতে মকসেদের কোন আগ্রহ নেই। সে সমানে দাঁত ডলছে। শব্দ যা করছে তা থুতু ফেলবার। শরিফা ঘরে ঢুকেই ধড়মড়িয়ে কপাট দিলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল- ও মা, ঐ শুয়োর কখন আসলো?- ক্যান কী হয়েছে, তুই অমন করছিস ক্যান?- মা, আমি বাঁচমুনা মা, আমাক বিষ দ্যাও মা; তুমার মকসেদ ছাড়া কেউ এ .. … । কথাটা শেষ না করেই থমকে গেল শরিফা। দ্রুত ভেবে নিলো। মকসেদ এ কাজ করলে সে এখানে কেন? তবুও মনকে বুঝাতে পারে না।- ক্যানরে মা, অমন করছিস ক্যান? একটু শান্ত হ মা। খুলে বল। সেরাজ এগিয়ে এলা মেয়ের কাছে। মা হাতপাখা ঘুরাতে লাগলো মেয়ের মাথাতে।- আব্বা, কুসুমকে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই বলছে এটা মকসেদের কাজ। কিন্তু.. ..। মেচাকার হল, কিছু ভাঙলো না। বিদ্যুৎ চমকালো, শব্দ হল না। যা একটু হল, তা ধপ করে বিছানাতে বসবার। সবাই কিছুক্ষণ নিরব। আর কিছুক্ষণ যেতেই মায়ের মধ্যে নতুন করে  একটা ক্ষোভ জন্ম নিলো। তার ছেলে না হয় একটা ভুল করেই ছিলো। তাই বলে সারা জীবন এর দাগ বয়ে বেড়াতে হবে। মাগীর বেটি কার সাথে পালালো আর দোষ পড়লো মকসেদের ঘাড়ে। সখেনা এতদিনে বুঝলো, মকসেদকে হারামি কুসুমই ফাঁসিয়েছিল। ছোট হলে কি হবে, মাগী হাড়ে হাড়ে বজ্জাত।- ও মা ও আব্বা, তোমরা চুপ ক্যান, আমি এখন কী করবো?  বাপ মায়ের জমাট চুপ থাকাটা শরিফা কতকটা চিল্লিয়ে ভাঙতে চাইলো। তবে মনের মধ্যে কিছুটা সান্ত¦না এনেছে,  মকসেদ এখন বাড়িতে।- তা কী করবি, একটা ঢোল কাঁধে লে, ঢোল পিটে বল, আমাদের মহারানি কুসুম হারিয়ে গেছে। নাঙচুন্নি কুনঠেকার! খেঁকিয়ে উঠলো সখেনা। গালিটা শরিফাকে দিলো নাকি কুসুমকে বুঝো গেল না। তবে শরিফা বুঝলো এটা কুসুমের প্রাপ্তি।- দেখ মা, আমার মকসেদ ভালো তা বলব না, তবে এ কাজ যে সে করেনি সেতো তুইও দেখলি। এতদিন তোরাই বলতি, তোরাকেন আমরাও ভাবতাম, কুসুম ছোট মেয়ে, মকসেদতো বড়। সে কেন এ ভুল  করলো। সবাই দোষ দিতাম মকসেদকে। এখন দেখ, কুসুমটা কত খচ্চর। সেরাজ কিছুটা সুযোগ পেল ছেলের জন্যে সাফায় গায়তে।- আমি জানতাম, ঐ মাগী ছোট হলে কী হবে, সে ঠিক গস্তান,। সে-ই আমার আলাভোলা মকসেদকে এভাবে চাঙ্গা করে তুলেছিল। মাও সুযোগ নিলো। সেদিন কেউ আর কথা বাড়ায়নি। শরিফা তখনই ফিরে গিয়েছিল বাড়ি। সে জাহির করেছিল মকসেদ এটা করেনি। তাছাড়া ভাইকে ভালো মানুষ প্রমাণ করতে যতকিছু করবার বা গল্প দেবার দরকার, তা সে করেছে। এদিকে মকসেদও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলো তাদের বাড়িতে; বাপ-মায়ের কাছে। কিন্তু কুসুমের খোঁজ মেলেনি তখনো।
– একটু গলা খাকারিতো দিতে পারো? ভয়ে জানটা ছিল না এতক্ষণ। বুকে তিনবার থুপ দিয়ে জড়িয়ে ধরলো মকসেদকে। মকসেদ তখনো হামাগুড়ি দিয়ে। এক্ষেত্রে মকসেদের মাথাটাই বুকে নিতে পারলো। এতেই স্বস্তি আর শান্তি মিললো কুসুমের বুকে, মনে, দেহে।- ভয় যেন তোমার একা সম্পত্তি। আর কারও লাগে না বুঝি। কুসুম রানিকে গান শুনাতে শুনাতে আমি বাসর ঘরে ঢুকবো মনে হয়? দুজনে এবার পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসলো। খাবারের বাটিটা একপাশে রেখে দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।- এই জায়গাটা খুব খারাপ। এমনিতেই কটকটে অন্ধকার, তার ওপর ওগুলো। সামনে আঙ্গুল উঁচিয়ে কিছু একটা দেখাতে চাইলো কুসুম। মকসেদ তাকাতেই দেখতে পেল পাশাপাশি চারটি বাতি জ্বলছে। বাতি নয়, চোখের বাতি। দুটো গাবড়া (বনবিড়াল) ঠিক তাকিয়ে আছে এদিকে। ভয়হীন চারটি চোখ। তবে এদিকের চোখে ভয় ধরাবার মত আলো বটে। এই চাতাল অনেকদিন ধরেই গাবড়ার আখড়া। আরও কিছু থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু উপায় নাই, এরচেয়ে নিরাপদ জায়গা দ্বিতীয়টি নেই তাদেও জন্যে।এই গোয়লঘর মূল বাড়ি থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন। তবে গোয়ালঘরের ভেতর দরজা বাড়ির সাথে লাগানো। মকসেদের তিনপুরুষের আগের গোয়লঘর এটি। একসময় তারা যে বেশ গরু পুষতো, এটা তার প্রমাণ। এখনও আছে পাঁচটি। গোয়ালের চাতালে দুনিয়ার খড়ি আর নুন্দাতে ভর্তি। ঘুটঘুটে অন্ধকার। গোটা এলাকার গাবড়া নাকি এই চাতালেই থাকে। দু চারমাস পরপর সাঁওতালরা আসে তীর-ধনুক নিয়ে। নির্ঘাত মারেও দু একটি। সেরাজের ওপর এলাকার বউ-বেটির ক্ষোভ যে নেই, তা নয়। তাদের ধারণা, সেরাজ ইচ্ছা করে গাবড়া পুষে; তাদের হাঁস-মুরগি গেলাবার জন্যে। আজ সে গোয়ালেই আস্তানা গাড়লো তারা। মকসেদ আর কুসুম। নুন্দা সরিয়ে, খড়ি সরিয়ে, একটা চৌবাচ্চার সমান আস্তানা। গড়পরতা জেলখানার ১১ নং সেল। কোন রকমে শোয়া যায়, নড়া যায় না। কোন কঠিন অপরাধে তারা কয়েদি না হাজতী, সে হিসাব পরে; তবে তারা যে অপরাধী, এটা ঠিক। এ সেল-জীবন আপাতত তারা মেনে নিলো।যা এনেছিল তা নিজেই খাওয়ালো কুসুমকে। মুখ মুছিয়ে দিলো গামছা দিয়ে। ভেজা মুখের ওপর একটা চুমুও এঁকে দিলো। কুসুম বাধা দিলো না। বরং আরও কাছাকাছি হল দুজন। পেছন দিকের খড়ির ঢিবিতে হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে একটা শব্দ হল।  বিড়াল বা গাবড়া কোনকিছুর ঘাড় মটকালো বোধহয়। অন্তত তারা তাই ভাবলো। সামনের চোখ চারটি এখন আরও উজ্জ্বল। নড়াচড়া করছে অনবরত। মনেহয় একে অন্যের সাথে বলাবলি কিংবা বিলি কাটছে। মিশি অন্ধকারে গাবড়ার চোখকটিই ভরসা এখন।- এত দেরি হল কেন? কুসুম মকসেদের হাঁটুতে মাথা রাখতে রাখতে বলল।- খাবার নেবার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। মা ঘুমাতে গেল অনেক পরে।- দিনেও একবার করে এসো কিন্তু। দম বন্ধ হয়ে মরে যাব। – খোল বাতাসে থাকলেই বুঝি বুক ভোরে বাতাস নেয়া যায়? ইচ্ছাতো হয়, এই অন্ধকারে পড়ে থাকি সারাক্ষণ। কিন্তু বুঝই তো .. ..। আর বলতে পারলো না মকসেদ। গলাটা ধরে এলো।- কতদিন আমরা এভাবে থাকবো?- জানি না! একটা লম্বা বাতাস বেরুলো মকসেদের গলা দিয়ে। কিন্তু ফিসফিসিয়ে বলা পরের কথার মধ্যে সেটি আর ভিন্ন করে ধরা পড়লো না। – তবে এখানে থাকবো না বেশিদিন, এটা বলতে পারি। আনমনাভাবে আবারও বলল মকসেদ। চোখ তার গাবড়ার দিকে। হাত বিলিকাটছে কুসুমের মাথায়।- এতকিছু যোগাড় করলে কীভাবে?- কী?- কলসী, বালতি, থালা, বদনা আর চট।- এ সংসার একদিনে বাঁধিনি গো। আস্তে আস্তে বেঁধেছি।- আমার কিন্তু ভাললাগে না এসব।- কী?- এই যে, আমার পেসাব পায়খানা তোমাকে ফেলতে হয়।- উপায় নেই। তবে তুমি পুষিয়ে দিয়ো অন্যকিছুতে।- এত কষ্টেও তোমার রং আসে কোথা থেকে?- আমার রঙের নদীতো তুমি। এখানেইতো ডুবে আছি।- বাদ দাওতো, রঙের কথা আমার ভালো লাগছে না।- ভালো না লাগলে হবে, রঙ্গিলা? আমি যে এখন রং নদীতে সাঁতার কাটবো।কথা আর হল না। দুজনা আরও ঘন হলো। দৃষ্টি সীমানা টপকিয়ে দেখতে লাগলো এক অপরকে। হোক অন্ধকার, তারা ঠিক দেখছে পরিপাটি করে। সামনের গাবড়া দুটোর চোখও যেন মিলে এক হয়ে গছে।  চার চোখ এখন এক হয়ে জ্বলছে। তবে মাঝে মাঝে শব্দ করছে ভয়ংকর। তাদের শব্দের কাছে ম্লান হয়ে যায় অন্য দুজনের সকল শব্দ। যেন গাবড়া দুটো বলছে, তোমরা কথা বল, শব্দ কর, আমরা তা পাহারা দিচ্ছি আমাদের শব্দ দিয়ে।এভাবে পার হলো একদিন, দুদিন। পার হলো সাতদিন। মকসেদের শরীরে লেগে থাকা দাগ এরমধ্যে খসে পড়তে শুরু করেছে। গ্রামের মানুষ তার ভালো গুণগুলো নিয়ে জমির আলে, পুকুর ঘাটে কথাও বলছে টুকটাক। আগে যেমনটি করতো, তেমন না হলেও শুরু করেছে। মকসেদের মা, মকসেদের বোন এখন পাড়াতে ঘুরতে বেড়ায়। গল্প করে। মা সখেনা আঁচলে কয়েকটি পান বেঁধে নিয়ে বের হয় অনেক সময়। আঁচলের গিট খুলে দু একজনকে খেতেও দেয়। আল্লাদ করে পিক ফেলে। অপেক্ষা করে, কেউ মকসেদের কথা তুলে কি না।দশম দিনটা আর একাদশে পড়লো না। দশমদিনেই পড়লো হইচই।  হইচই ফেললো নিজের বাপ। সেরাজ। সেরাজ তিনদিন আগেই বিষয়টা টের পায়। কাউকে বলেনি। বউকেও নয়। নিজের সাথেই যুদ্ধ করেছে তিনদিন তিন রাত।  অবশেষে আর পারলো না। হেরে গেল সিরাজ। নিজেই লোক ডাকলো আর বিচার বসালো। বিচার বসলো পরের দিন অর্থাৎ কুসুম-মকসেদের একাদশ দিনে। এটা তাদের কোন একাদশী, কেউ জানে না। জানবার কথাও নয়। প্রায় সাত গাঁয়ের মানুষ জুটেছে আজ। গমগম আওয়াজ হচ্ছে সেরাজের খৈলানে। পুচকে ছোঁড়ারা কেউ কেউ গাছের ডালে উঠে জায়গা নিয়েছে যে যার মত। শালিসের মধ্যিখানে বসে দু’জন। মকসেদ আর কুসুম। যেন কিছু হয়নি, কিছু ঘটেনি। নির্বাক অথচ ভাবলেশহীন। যত উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, ঘৃণা উপস্থিত জনতার। মকসেদ যেন জানতো, এমনটি ঘটতেই পারে। জানতো কুসুমও। আজকের বিচার কার্যে নির্দিষ্ট বিচারক কেউ নেই। আজ সবাই বিচারকের আসনে। শুধু মাথা নিচেু করে বসে আছে আসামী দুজন। তাদের খানিক বাদে বসে আছে কুসুমের বাপ। আর একটু দূরে বসে আছে রফিক।
বৃষ্টি নেই কমাস। যেন কত যুগ। তখনো গভীর নলকূপ আসেনি এদিকটাই। বিলকুমারীর ধারে, শিবনদের ধারে  ইরি ধানের যে জোয়ার, তা শুকিয়ে গেছে। পানির অভাবে মরেন গেছে খেতের পর খেত। শান্তি নেই মানুষের মনে। ভালো কথাতেও খেঁকিয়ে উঠে লোকজন। তার উপর এই অনাচার। খোদার গজব নামে কি আর সাধে? তবে আজকে হঠাৎ করে আকাশে হালকা মেঘ দেখা গেছে। বিচার কার্য যেখানে, সেই খৈলানে এখন ছায়া। মেঘের ছায়া। বৈশাখের ঝাঁঝ নেই বিচারালয়ে। এতেও মানুষ খুশি। আল্লার শান্তি ছায়া জুটেছে আজ। সাবার ধারণা, তারা আজ ভালো একটা কাজ করতে যাচ্ছে। সবার চোখ মকসেদ-কুসুমের দিকে থাকলেও, তারা ঘনঘন আকাশের দিকে তাকাচ্ছে; মেঘগুলো কখন পড়বে বৃষ্টির ফোটা হয়ে।হঠাৎ গুঞ্জন থেমে গেল। সেরাজ উঠে দাঁড়িয়েছে।  গলাতে গামছা। গলার গামছার এক কোণা দুহাতের মধ্যে নিয়ে জোড়হাত করে দাঁড়ানো। সবার ধারণা, ছেলের হয়ে ক্ষমা চাবে সে। ছেলেকে এবারের মত ক্ষমা করে দিতে বলবে। বলবে তাদের অর্থাৎ মকসেদ-কুসুমকে সবাই যেন মেনে নেয়। বিয়ে দিয়ে দেয় সমাজের মানুষ। কিন্তু তা হল না। সেরাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলল। আর একবার চমকে উঠলো সবাই। এ কোন সেরাজকে দেখছে আজ। সেরাজ বলল- বাপুরে, তোমরা আমার কাছে বিচার দিবেন কি, আমিই আজ তোমাদের কাছে বিচার দিচ্ছি।  ঘটনা যা জানবার তা তোমরা আগেই জেনেছ। আর তারা দুজনেই তোমাদের সামনে। আমার এই কুলাঙ্গারকে এমন শাস্তি দাও, যেন আর কোনদিন তার মুখ আমাকে দেখতে না হয়। তাকে পুঁতে ফেল মাটিতে।কুসুমের আব্বাও লাফ দিয়ে উঠল- আমারও একই কথা। কুসুমের মুখ আমি আর দেখতে চাই না।বিচারালয়ের সবচেয়ে বৃদ্ধ ব্যক্তিটি অর্থাৎ দবির শেখ হাত উঁচিয়ে সবার শোরগোল থামাবার চেষ্টা করলো। কী একটা বলতেও চায়লো সে, কিন্তু বলা হল না। এরমধ্যে রফিক লাফ দিয়ে উঠলো- আমার একটা অনুরোধ ছিল। আপনারা আমার কুসুমকে কোন শাস্তি দিয়েন না। তার শাস্তি আমার পিঠে নিচ্ছি। শুধু আমার কুসুমকে আমাকে দেন। আমি অনেক দূরে তাকে নিয়ে চলে যাব। তোমাদের কাউকেই আর দেখতে হবে না তার মুখ। আমাকে ভিক্ষা দেন। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো রফিক। তবে কাঁদলে কী হবে, তার পাশে বসে থাকা চাচা দড়মড়িয়ে কয়েকটা থাপ্পর লাগালো রফিককে। সে এখন হাঁপাচ্ছে।- শুয়োর বলে কি? চারধার থেকে চিল্লিয়ে উঠলো সবাই। কেউ কেউ বলে উঠলো- আগে ঐ শালার বিচার কর, পরে এদের দুজনের।  দূরে থেকে এক বুড়ি চিল্লিয়ে বলল- ম্যাইগের ভাওড়া কুনঠেকার। একতো এঁটে বাসন, তার ওপর কুত্তা-চাটা। হারামীর পিত্তি বলতে কি কিছু আছে? মার শালাকে। বেজন্মা, হারামী। আরও শত গালি দিতে লাগলো বুড়ি।আবু হেনা অরফে হেনজাল মোড়ল উঠে দাঁড়ালেন। হাত ইশারাই সবাইকে থামতে বললেন। দপ করে নিভে গেলেও উলকি থেকে থেকে দেখা যাচ্ছিল কোথাও কোথাও। মোড়ল চেয়ারে বসে তার কথা বলতে লাগলেন। – শোন তোমরা। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একে তো আবাদ-পানি নিয়ে আমাদের মনের অবস্থা ভাল নেই। তার ওপর এই অনাচার। এরমধ্যে জগলু কামলা লাফ দিয়ে উঠলো; যে পনেরো দিন ধওে কোন কাজ পায়নি – সমুন্দিকে পুঁতে ফেল।আর একজন বলল – শালাকে জুতার মালা পরিয়ে, চুনকালি মাখিয়ে সারা গ্রাম ঘুরানো হোক। কেউ বলল – দুজনেরই মাথা কামিয়ে দেয়া হোক।হেনজাল এবার কিছুটা রেগে গেল- তোমরাই তো সব কওে ফেললে। আমার তো কিছুই করতে হল না।পাশের একজন টেনে বসালো মোড়লকে।- আপনাকে রাগলে চলবে?  চিরদিনের মত আপনিই একটা সুরাহা করে দেন। আমরা তাই-ই মেনে নেব। সবাই তার কথাতে শোরগোল করে সম্মতি দিলো।- তবে শোন। মকসেদ-কুসুম মহা অপরাধ করেছে। তারা সম্পর্কের দেয়াল টপকে জঘন্য অপরাধ করেছে। তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। তাই বলে তাদেরকে মেরে ফেলবার অধিকার আমাদের নাই। মাওলানা সাহেব আছেন, তিনিই এদের শাস্তির ফায়সালা দিবেন। সাফ কথা, এই মকসেদকে দেশান্তরি হওয়া লাগবে। তার ছায়াও যেন আমাদের দেখতে না হয়। আর এখানকার বিচার শেষে কুসুমকে তার বাবা নিয়ে যাবে। তাদের সমাজ যে সিদ্ধান্ত নিবে, তা নিবে; এতে আমাদের কিছু করবার নাই। কী বল তোমরা? সবাই মোড়লের কথাতে সাঁয় দিলো। মাওলানা অর্থাৎ ঈমাম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তিনি আউজুবিল্লাহ বিসমিল্লাহ কেরাত করে পড়ে সবাইকে একটা লম্বা সালাম দিলেন। সবাই এর উত্তর দিলো সমস্বরে। – পিয়ারে হাজিরিন। এরা মহা গর্হিত কাজ করেছে। ইসলাম বলে এদেরকে মাঁজা পর্যন্ত পুঁতে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতে। আমাদের চলতি আইন তা বলে না। আমাদের হাত-পা বাঁধা। তাই গুরু পাপে লঘু দ- দিয়েই আমাদের থামতে হবে। দেশের আইন আমাদের মানতেই হবে। এটাও ইসলামের রীতি। এদেরকে একশত একটা দোররা মারা হোক। এটাই হোল বিধান। উৎসুক জনতার মধ্যে শোরগোল বাড়লো। এরমধ্যে অনেকেই দোররা মারা দ্যাখেনি কোনদিন। তাদের আগ্রহের অন্ত নেই। যাদের নির্দেশ দেয়া হল কঞ্চি কাটতে তারা দোড় দিলো। অবশ্য আরও কয়েকজন দোড় দিলো তাদের সাথে।দশটি কঞ্চি একসাথে সেঁটে বাঁধা হল, গোড়াতে , মধ্যে আর অগ্রভাগে। মারবার দায়িত্ব দেয়া হল শুকুর আর আফাজকে। তারা দুজনেই জোয়ান আর তাগড়া। প্রথমে দুজনকে শপথবাক্য পড়ানো হল, নিজ নিজ সন্তানের মাথায় হাত রেখে। মারবার ক্ষেত্রে নিজের শক্তির সবটুকু ব্যবহার করবে বলে শপথ পড়লো তারা। সবচেয়ে বড় কথা আসামী পক্ষের কাছ থেকে কিছু শোনা হল না। তবে আসামী পক্ষও যে কিছু বলতে চাই, এমন কোন আলামত এ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। প্রথমে মারা হল মকসেদকে। মারবার ভার পড়লো আফাজের ওপর। মারা হল কোমর থেকে হাঁটুর মধ্যে। শপাং শপাং। ধারে কাছের গাছে দু একটি পাখি হয়তো চিৎকার দিলো; উড়ে গেল। উপস্থিতিরি কেউ চোখ বুঁজলো। অথচ খানিক আগেও তাদের কত আগ্রহ ছিল ডোররার শব্দ শোনবার জন্যে। কিন্তু মকসেদ এক পাথর-মূর্তি। সে এক অন্য মকসেদ। আঘাত তাকে লাগে না। আঘাত লাগে সেরাজকে, আঘাত লাগে সখেনাকে, আঘাত লাগে বিচারালয়ের অনেককেই। কিন্তু মকসেদ নির্বাক। চোখে পানি পর্যন্ত নেই। দূর থেকে কার একটা কথা শোনা গেল।- শালা, বিলায়েই গোশতো খাইছে। দশটি বাড়ি মারা হলো মকসেদকে। দশটি কঞ্চি দিয়ে বাঁধা আটিতে দশটি বাড়ি। অর্থাৎ দশ দশে একশটি ডোররা হয়ে গেল। থাকে আর এক বাড়ি। এবার আঁটি খোলা হল। একটি কঞ্চি দিয়ে মারা হল একটি বাড়ি। ঠিক তখনই আস্তে আস্তে বসে পড়লো মকসেদ। কিন্তু কেউ এগিয়ে গেল না কাছে। কেউ অনুভব করলো না, তার বড় তেষ্টা পেয়েছে।এবার ভার পড়লো শুকুরের ওপর। দ্বিতীয় আঁটি দিয়ে মারা হবে কুসুমকে। এক বাড়ি, দুই বাড়ি, তিন বাড়ি; চার বাড়ির জন্যে হাত উঠালো শুকুর। কিন্তু মারতে পারলো না। হাউমাউ করে কেঁদে তাকে জাপটে ধরলো রফিক।-  ভাই আর মেরো না ভাই, মরে যাবে ভাই। বাঁকি কয়টা আমার পিঠে মারো। আরও দুইটা বেশি মারো ভাই।তিনচারজন টেনে হিঁচড়ে একধাপ নিয়ে আসলো রফিককে। অনেকে অনেক খিস্তি করলো তাকে। ওদিক থেকে আট বাড়িতে নেতিয়ে পড়লো কুসুম। বাঁকি তিন বাড়ি মারা হলো নেতিয়ে পড়ে থাকা অবস্থায়। একটা কম হলে নাপাকী আর যাবে না। তবে নতুন করে বিচার হলো রফিকের। মাওলানার সাফ কথা। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তারা সমান অপরাধী। রফিককেও ডোররা মারবার হুকুম হলো। মারাও হলো। তবে রফিক টলে পড়লো না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হজম করলো একশ একটা ডোররা। নেতিয়ে না পড়লেও অঝোরে পানি ঝরছিল দুচোখ বেয়ে। তবে মনে হচ্ছিল এত পানি তার নিজের জন্যে নয়, কুসুমের ব্যাথ্যার জন্যে। আর সেভাবেই বারবার দেখছিল কুসুমকে।বিচারকার্য শেষ হলেও মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। সবাই তাকিয়ে কুসুক ও মকসেদের দিকে। তারা দুজনেই মাটিতে পড়ে আছে। রফিক তখনো দাঁড়িয়ে। চোখ কুসুমের দিকে। প্রথমে কুসুমই নড়ে উঠলো। আবার নতুন করে শোরগোল উঠলো চারদিকে। কেউ যেন বলল- এযে মেয়ে লোকের জান গো; কৈ মাছকে হার মানায়। এই সময়টার জন্যে যেন অপেক্ষা করছিল রফিক। লাফ দিয়ে পড়লো; হামাগুড়ি দিয়ে পড়লো কুসুমের ওপর। চারদিক কাঁপিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। বারবার ব্যর্থভাবেই জোর করে জাড়িয়ে ধরছে কুসুমকে। যদিও তা একপাক্ষিক। কুসুমের চোখ কী যেন খোঁজে। অন্য কাউকে। রফিক ডোররাতে মরেনি; এবার ঠিক মরবে যেন। কান্নার আওয়াজ তাই বলে। রফিক নিজের জানটা উপড়ে কুসুমের হাতে দিতে চায়। বলতে চায়, কুসুম আমার জানটা তোমার আঁচলে বাঁধ কিংবা তলা ফাটা গাঙে ফেলে দাও। তুমি ছাড়া দরকার নাই এই জীবনের। জড়িয়ে ধরলো কুসুমকে। এবার কেউ বাধা দিলো না রফিককে। টেনে হিঁচড়ে নিতেও গেল না কেউ।আরও হাজার কথা হলো সেই বিচারে। কেউ রফিকের পক্ষে কেউ আবার বিপক্ষে। শেষতক জিতলো রফিক। বিচারকের পা ধরে কাঁদাতে লাভ হলো তার। বিচারের রায় হলো এমন- রফিক তার বউকে নিয়ে আগামীকালের মধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যাবে। আর মকসেদকেও নিরুদ্দেশ হতে হবে। এলাকাতে তাদের ছায়া দেখা হারাম ঘোষণা করলো বিচারক। বিচারক যা একটু সাওয়াল-জবাব করেছে তা রফিকের সাথে। কুসুম বা মকসেদের কোন কথা শুনেনি তারা। বিচারের রায় হতে যা দেরি। অমনি রফিক কুসুমকে পাঁজা করে তুলে নিলো। পিছনে না তাকিয়েই সামনে দোড় দিলো ক্লান্ত দেহে। যেন আগুনলাগা বাড়ি থেকে কোন রকমে বউকে উদ্ধার করছে রফিক। এতকিছুর পরে এত শক্তি রাফিকের কোথায় ছিলো? এটাই এখন ভাবছে উপস্থিতির সবাই। আকাশে তখন আর মেঘ নেই। রোদের তাপ বেড়ে উঠেছে অনেকখানি। কিছুটা আশা জাগা মানুষেরা এখন আর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে না। মকসেদের দিকেও তাকিয়ে নেই। তারা তাকিয়ে রফিকের যাওয়া পথের দিকে।জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় গেল, শ্রাবণও গেল। ভাদ্র যায় যায়। বৃষ্টি নেই। কত ব্যাঙ বিয়ে দিলো মানুষ দলে দলে। স্কুল মাঠে বৃষ্টির জন্য মোনাজাতও হলো দুদিন ধরে। কাজ হলো না। দ্বিতীয় দিবসে নাকি একখ- মেঘ দেখেছিল কেউ কেউ। ফুর্তি এসেছিল মনে, কিন্তু ফুর্তিটা বেশিক্ষণ থাকেনি। মিলিয়ে গেল মেঘ, মিলিয়ে গেল ফুর্তি। চারদিকে অভাব আর অভাব। অনেক পরিবারকে অভুক্ত রাত কাটাতে হয়। অতীতের দুর্ভিক্ষ যারা দেখেছে, সেই বৃদ্ধরা এখনকার সময়কে মিলাতে চায় সেই অসময়ের সাথে। অনেকে বলে, এযে কিয়ামতের লক্ষণ। পাপে ভরে গেছে দুনিয়া। কতই আর সহ্য করবে আল্লা। অনেকেই দায়ী করে মকসেদকে, দায়ী করে কুসুমকে। তারা অবশ্য এখন নিখোঁজ। প্রায় তিন মাস হলো তাদের দ্যাখেনি কেউ। রফিক তার কুসুমকে নিয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে, তার বাপ মাও বলতে পারে না। আর মকসেদের খোঁজ কেউ নিতে চায় না। সেও নেই তিন মাস ধরে। এই অভুক্ত খরাপিষ্ট মানুষের সান্ত¦না বলতে এটুকুই।
আজ এভাবেই বৃষ্টি নামলো। মাঠ-ঘাট ঝাপিয়ে বৃষ্টি। বৃষ্টি নয়,  শান্তি নামলো গ্রাম জুড়ে, এলাকা জুড়ে। বৃষ্টি যেন বেহেস্তী কুসুম হয়ে ঢেকে দিলো মাঠ-ঘাট। আর তাই-ই খই হয়ে ফুটছে এখন। ফুটছে মানুষ। ঠিক এমন সময় এলো খবরটা। মকসেদকে পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে রামবিলাসের দোকানের বারান্দায়। তবে এই খবরে মানুষের মনে যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছিল, তা বেশিক্ষণ টিকলো না। যেন হঠাৎ করে কৈ মাছের কানের কাঁটাটা সবার গলায় আটকে গিয়েছিল, আবার গরম ভাতের দলা ছাড়াই হঠাৎ করে নেমে গেল ব্যাথাহীনভাবে। মকসেদ মরেছে। মরে পড়ে আছে রামবিলাসের দোকানের বারান্দায়। হাতে বিষের শিশি। তার মরার খবরে  আরো একবার থমকে গেল মানুষ। তবে এবার শঙ্কায় নয়, আনন্দে। আফসোস করলো কেউ কেউ, শালা আগে মরেনি কেন। বৃষ্টিটা আরও আগে পেতাম।মাঠের প্রাথমিক কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরলো মানুষ। কাদা-পানিতে ভেজা মানুষগুলোকে ভূতের মত লাগে। চোখ দুটো জল-কাদার মাধ্য হতে উঁকি দেয় থেকে থেকে। নিজেকে পারিস্কার করবার আগেই আর একটি খবর পেল সবাই। আবারও থামলো সারা গ্রাম। আকুবুড়ি মারা গেছে। মারা গেছে বাড়ির কোণায় রাধা-মাধবের ঘরে। রাধা-মাধবের পায়ের কাছে মরে পড়ে আছে বুড়ি। কখন মরেছে কে জানে। তবে বৃষ্টি থামলে খোঁজ হয়েছে। মানুষ ভেবে পায় না। এ কেমন লীলা খোদার? মরণ দুটো, কিন্তু কার মরণে কী ঘটলো বুঝে পায় না মানুষ। তবে আকুবুড়ি তার কাঁপা গলায় প্রায়ই বলতো- বৃষ্টি না দেখে মরছি না বাছা। খরা কেন, আগুন জ্বললেও মরব না। আকুবুড়ির এক কথা। হায়রে দুনিয়া; একজন মরল বলে বৃষ্টি হল, আর অন্যজন বৃষ্টি হল বলে মরল। গ্রামশুদ্ধ এমনটাই ভাবলো মানুষ।সন্ধায় পোড়ানো হল বুড়িকে। ঢল নেমেছিল শ্মশানে। যত হিন্দু তার অধিক মুসলমান। একসাথে পাত পেড়ে মিষ্টি খেল। এতে মুসলমানও চাঁদা দিলো। আকুবুড়ি বলে কথা। এযে বৃষ্টি দেখা বুড়ি। মকসেদকেও দাফন করা হলো। দাফন করা হলো পরদিন সকালে। তার দাফনেও লোক একেবারে কম হয়নি। মানুষ যতটা কম ভেবেছিল, তার দশগুণ হলো লোক। এত বৃষ্টি, সেতো মকসেদের মৃত্যুর আশির্বাদেই। এ মরণ তাদের বেঁচে ওঠার মরণ। শুধু বেবুঝ নয়, বুঝের মানুষের মনেও আজ এই আন্দাজ।দাফন কাজ শেষ করে ফিরবার সময় তৃতীয় খবর শুনলো তারা। শুধু তারা নয়, গ্রামের সবাই শুনলো। এমন খবর দ্রুতই শুনে মানুষ। তৃতীয়বার থমকালো সবাই। কুসুম গলায় ফাঁস দিয়েছে। হয়তো মরেছে একসাথেই। কুসুম আর মকসেদ। কিন্তু কী করে একসাথে সম্ভব। দুজন দুই প্রান্তে। অথচ মরল একসাথে। মানুষ এ নিয়ে ভাবলো না। শুধু এইটুকু ভাবলো; তারা দুজনেই মরেছে। #

 

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ