Home > সাহিত্য ও সংস্কৃতি > তরুণ কবিদের স্বপক্ষে থাকার আগে : খুরশীদ আলম বাবু

তরুণ কবিদের স্বপক্ষে থাকার আগে : খুরশীদ আলম বাবু

 

রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক সাব্যসাচী লেখক। তরুণ কবিদের বলেছেন, ধীর স্থির প্রকৃতির হতে। মারিয়া রাইনে রিলকে এক তরুণ কবিকে লেখা চিঠিতে জানিয়েছিলেন“তোমাকে আত্মানুসন্ধানী হতে হবে।” আসলে শুধু তরুণ কবিই নয়, সব নলেখকদের ক্ষেত্রেই এই উপদেশ প্রয়োজ্য। ওয়ার্ডসওয়ার্থ একসময় দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন; তরুণরা যৌবনের উন্মাদনায় অসম্ভব সৃষ্টিধর্মী হয়েও পরে আর তাল সামলাতে পারে না। পরিণত হয় ট্র্যাজেডির নায়কে। হয়তো এই আক্ষেপের নেপথ্যে ছিলো তাঁর বন্ধু এস টি কোলরিজের জীবন উপক্যান। এখন আমার প্রশ্ন হলো তরুণ লেখক কারা? আজকের অনেক প্রবীণ সাহিত্যিকই সগর্বে ঘোষণা করেন যে, তারা এখনো তরুণ। আমি কোন বির্তকে যাবো না। তরুণ কবি তারাই যাঁরা নতুন ভাবে লিখতে আরম্ভ করেছেন, লিখতে পারেন, আর লেখাটা যদি সাহিত্য গোছের কিছু জাতীয় হয়। প্রমথ চৌধুরীর মতামতও অনেকটা সেই রকম। আমাদের দেশে আমি লক্ষ্য করেছি, পাঠকের তুলনায় লেখকের সংখ্যাই তুলনামূলক ভাবে বেশি। এই লেখকেরা যদি ভালো পাঠক হতেন, তাহলে আমাদরে চলমান সাহিত্য আরো ভালো হতো। আসলে সেই রকম পরিবেশই তৈরি হয়নি। প্রথমত কারণ দু’টি: আমাদের লেখক গোষ্ঠীরা এখন অবধি নানা গোত্রে বিভক্ত, রাজনীতিতে মাথা ঢুকিয়েই এই সর্বনাশটা করেছে। লেখক পরিচয় দেবার আগেই পরিচিত হয় এই রকম উনি বামপন্থি, উনি মৌলবাদী। আমাদের সাহিত্যে সাম্প্রতিক কালের শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদকে নিয়ে এই রকম বিতর্ক বেশ কিছুদিন আগে সরগরম রেখেছিলো। একদল তো আল মাহমুদকে নিয়ে প্রকাশ্যে বর্জনের চেষ্টাও চালালো খোদাকে ধন্যবাদ যে, তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। উদানিং আল মাহমুদকে নিয়ে আবার আলোচনার সূত্রপাত হচ্ছে। এটা আমাদের সাহিত্যে এক ধরনের সুবাতাস বটে। আসলে পরিচয়ের বির্তকটা চিরকাল প্রবাহমান থাকে না; কারণ এতে মূল্যায়নের সুবিধা হয়। তরুণ কবিরা কবিতা লিখছেন বটে, কিন্তু ক্যামন লিখছেন? এই পর্যালোচনায় যাওয়াটাই বোকাম।ি কারণ সাহিত্যে কোন বিচারক নেই, ভালো মন্দের বিষয়টা কেবলমাত্র পাঠকেরাই নির্ধারণ করতে পারেন, করেও থাকেন। অথচ সাহিত্যে চিরকালই লক্ষ্য করা গেছে প্রবীণরা নবীনদের খুব বেশি প্রাধান্য দিতে রাজী নন, এই সংকীর্ণতা রবীন্দ্রনাথেন মধ্যেও ছিলো। বুদ্ধদেব বসুদেরও লড়াই করদেত হয়েচিল। বিস্ময়কর হলেও সত্য নজরুল ইসলাম ছিলেন এই সংকীর্ণতার উর্ধ্বে, অবশ্য নজরুল রবীন্দ্রনাথের স্বীকারের আওতায় ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। আমাদরে এই ধরিত্রীতে এখন মোটামুটি কয়েক’শ কোটি মানব ম-লীর বসবাস। এদের মধ্যে সবাই কবিতা সৃজন করেন না। সত্যি বলতে কি ¯্রষ্টা কবিতা লেখার মত দুরুহ সৃজনশীলতা সবার মধ্যে দেন না। এমন অনেকে ছিলেন- যারা জীবনে কস্মিণ কালেও একটি নকবিতা লেখেননি, কিংবা কবিতা লেখার কথা ভাবেননি, কবিতা না লেখে সমাজে বসবাস করেছেন। তাতে আমাদের বিশ্ব সংসারের খুব একটা অসুভিধা হয়নি। আমাদের মত সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরক্ষর দেশের অধিবাসীদেরকথা বাদই দিলাম। উন্নত সব্যতা গরীবন্ত দেশেও কবি ওকবিতা বিষয়ক একই সমস্যা রয়েছে। আমরা জার্মান উন্মাদ প্রতিভঅবান কবি হেন্ডারলিনের সাথে জীবনানন্দ দাশের সমিলতা দেখানোর চেষ্টা করেছি; সেই হেন্ডারলিন জার্মানির অধিকাংশ নাগরিকের স্মৃতি থেকে বিস্মরণ ঘটেছে। এক সময় আমেরিকাতে বিট কবিরা অর্থাৎ এ্যালেন গ্রীন্সবার্গ কেরুয়াক গোষ্ঠীর কবিতা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন, সেই আলোড়নের ¯্রােতও অনেক আগেই স্তিমিত হয়ে গেছে।
এটাই স্বাভাবিক, তরুণদের তেজ জোস চিরকাল স্থায়ী হয় না। আর হলেই মুশকিল। বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্য খানিকটা তাই। (‘কালের পুতুল’ গ্রন্থে সমর সেনের কবিতা বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে।) তাতে ফলাফল গোনা গুনতির ক্সেত্রে সুবিধা হয়। আমার বিশ্বাস সমাজে বেশি কবি থাকলে ভালো নয়। না, প্রতিহিংসার বশঃবর্তী হয়ে আমি একথা বলছি না। এই মহানগরীর অনেক কবির সাথে আমর দ্বন্দ্ব মধুর সম্পর্ক রয়েছে; তাদের সম্বন্ধে কটু বক্তব্য উচ্চারণ করলে তেড়ে ফুড়ে আসবেন, সেই কারণে আগে ভাগে একটু সাবধানতা অবলম্বন করাটা দরকার।
আজকাল প্রায়শ ভদ্র সমাজে বলতে শুনি যে, কবিতার বাজার নেই। সমাজে কবির সংখ্যা কাকের চেয়ে বেশি। এটা মোটা দাগের রসিকতা, নাকি অন্য কিছু, একন অবধি আমার বোধগম্য হয়নি। প্রথমটার উত্তরে অমি বলতে পারি যে, কবিরা ফেরিওয়ালা কিংবা ফুঁচকাওয়ালা নয়, তারা ‘কবিতা কিনুন’ বলে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাঁক দেবেন, চিৎকার করে জানাবেন আমি কবি আমাদের দেখুন। সুতরাং কবিতার বাজার না থাকলেও প্রকৃত কবির এমন কিছু যায় আসে না। আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ আজীবন পাঠকবিহীন অবস্থায় সৃজন করে গেলেন কবিতা। ( বিধাতাকে ধন্যবাদ! তিনি বুদ্ধদেব বসুর মত একজন বন্ধু পেয়েছিলেন।) তাতেও কবির কবিতা লেখার ছেদ ঘটেনি। ফরাসি কবি ভেরলেনও, তাঁর মৃত্যুর পর এই কবি যে পরিমাণ প্রত্যাশিত পাঠক পেয়েছেন, তারা জীবিত থাকলে একটু বিস্ময় বোধ করতেন, তা বলাই বাহুল্য। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা আমার কর্ম নয়। কারণ আমিও স্বয়ং একজন কবি কর্মী। তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে, এই সমাজে বসবাসরত সব মানুষই কবি, স্বয়ং বিশ্ব বিধাতাও একজন কবি। তা না হলে এই বৈচিত্র্যময় ধরিত্রী সৃষ্টি করতেন না। এই কারণে।ি কিনা জানি না, শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই এক আধটু কবিতা লেখার চেষ্টা করে থাকেন। একাজে অপরাধ আছে বলে আমার মনে হয় না। অপরাধ কর্মটিই যখন স্বভাব কবিতাকে আশ্রয় করে যখন কবিতা প্রকাশের চেষ্টা করে থাকেন। বর্তমানে লক্ষ্য করেছি এই শ্রেণির কবির সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। ফলতঃ যারা ভালো কবিতা লিখছেন, পাঠকরা তাদের চিনতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো এই যে, রাজনীতি এখন কবির ব্যক্তিগত পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করছে; যা রীতিমত দুঃখজনক। এটাকে কাব্য হিংসা না বলে প্রতিহিংসা বলাটাই স্বাভাবিক। জীবনানন্দ দাশ ও বিষ্ণু দে একই কোলকাতা মহানগরীতে বাসকরতেন, তাদের মধ্যে দুই একবার দেখা সাক্ষাত হয়েছিল, এমন তথ্য কেউ দিতে পারবেন না।
প্রত্যেকই প্রত্যেকের গ-িতে চলাফেরা করেছেন এবং এই শিবির বিভক্তিটা অনন্তকাল থাকবে বলে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। না থাকলে বৈচিত্র্য উধাও হবে, ঘটনা থাকতো না আর ঘটনা না থাকলে বৈচিত্র্য থাকবে না। বুদ্ধদেব বসু ও রক্ষণশীল সজনীকান্ত দাসের মধ্যকার লড়াই এক সময় পাঠকেরা বেশ চমৎকার উপভোগ করতেন। আসল কথা হলো কবিরা সাহিত্যের লড়াইয়ে লিপ্ত থাকলেই মঙ্গল। মুশকিলটা হলো অসাহিত্যিকদের প্রভাবটা আগের তুলনায় ক্রমশ বাড়তির দিকে।
সাম্প্রতিক কালের কয়েকজন তরুণ কবিদের কবিতা পড়ে আমার মনে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। আর সেটা আলোকপাত করতে গিয়েই “ধান ভানতে গাজীর গীত” গাইলাম আর কি। বেশ কয়েকদিন যাবৎ লক্ষ্য করছি, কবিতাকে এলোমেলোমীর বাজার বানিয়ে ফেলেছেন। তাদের কবিতা পাঠে মুগ্ধতার পরিবর্তে এদিক সেদিক ইতি উতি তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। তখন মনে মনে একটু ঈষৎ অন্যভঅবনার প্রশ্ন মনে এসে আঘাত করে সেটি হলো এই -কেন এরা কবিতাটি সৃজন করলেন? না লিখলে বাংলা কবিতা সাহিত্যের এমন কি ক্ষতির কারণ হতো? মোটেই হতো না। আমি ব্যক্তিগত ভাবে কেবল তরণ কবিদের দোষারোপ করার পক্ষপাতি নই।
বাংলাদেশের বর্তমান একজন বিশিষ্ট কবির কবিতা পড়ে আমার সেই রকম ধারণা করতে দ্বিধা হচ্ছে না। আমি সেই কবির নাম না বললেও তাকে চিনতে পাঠকের মোটেও অসুবিধা হবে না। মাঝে মাঝে মনে হয় এই কবির এখন কবিতা না লেখাটাই উচিৎ। কবি মোহিতলাল মজুমদার যখন দেখলেন যে, নতুন ভভাবে কবিতা সৃজন করতে পারছেন না, সেই মুহূর্তে তিনি কবিতা সৃজনের দ্বারে তালা দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য মোহিতলাল মজুমদার অসম্ভব সৎ কবি বলেই এটা সম্ভবপর হয়েছিল। আমাদের সাহিত্য এটি একটি বিরল ঘটনা।তবুও মোহিতলাল মজুমদারকে এখনো খুব কম স্মরণ করা হয়। বিশ্ব সাহিত্যে টি , এস, এলিয়ট এক সময় কেবল কবিতার পরিবর্তে সমালোচনায় নিজেকে নিবন্ধ রেখেছিলেন। বিষ্ণু দে যদি শেষ জীবনে কবিতা লেখা বন্ধ করতেন তাহলে বাংলা কবিতা সাহিত্যের এমন কোন ক্ষতির আশংকা থাকত না। কিন্তু সমস্যা হলো যে, আমাদের অধিকাংশ প্রধান কবিরা সেটা বুঝতে চান না। এই সমস্যা বিমোচনে তরুণ কবিদের এগিয়ে আসাটাই বাঞ্চনীয়। তবে তরুণ কবিরা একটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত নাচার এই কারণে যে, কাব্য জীবনের প্রারম্ভেই এই সমস্ত কবিদের প্রভঅবেই তরুণ কবিরা সুৃজন করে থাকেন। ফলতঃ ভবিষ্যৎ পাথেয় সম্বন্ধে বোঝার ক্ষমতা থঅকে না। এই ধারা সব দশকেই বিদ্যমান থঅকে, সুতরাং তরুণ কবির দায়িত্ব এক্ষেত্রে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার নামান্তর মাত্র তা বলাই বাহুল্য।
তাদের কবিতা পড়েই পরাবাস্তব শিল্পির আঁকা ছবির দিকে তাকিয়ে দর্শকের যে প্রতিক্রিয়া হয় ইদানীং আমার সেই রকম হচ্ছে। ছন্দ কোথায়? আর তালই বা কোথায়? খুঁজতে গিয়ে বারবার বিব্রত বোধ করেছি। অনেকের ধারণা কবিতা মানেই গদ্য ভঙ্গি, কবিতা সৃজনের জন্য যে লেখঅপড়া ইত্যাদির প্রয়োজন আছে তারা সেটা মানতে চায় না। বলা বাহুল্য এই সময় কবিতা পাঠকপ্রিয়তার পরিবর্তে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এতো কবিতা ছাপানো হচ্ছে, কবিতা কোথায়? সম্পাদক মহাশয়রা এসব ছাপেন কেন? গদ্য ছাপালেই পারেন। রাজধানীতে অনেক দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় কবিতা ছাপানো হয় লবিং গ্রুপের মধ্য দিয়ে। একজন প্রকত কবিকে যে লড়াই করতে হয়, তাকে ভয়াবহ বললে কম বলা হবে। প্রত্যেক সম্পাদকের নাকি একদল তল্পিবাহক কবি সম্প্রদায় থাকে। এই সমস্ত কবিদের কবিতা ছাড়া অন্য কারো কবিতা ছাপা হয় না। তবে আমি সবটাই বিশ্বাস করি না। বেশ কিছুদিন আগে এক লিটল ম্যাগাজিনে কবি সাজ্জাদ কাদিরের এক কবিতা বিষয়ক নিবন্ধ পাঠ করেছিলাম। পত্রিকাটির নাম ‘গণ সাহিত্য’ কিংবা ঐ গোছের মতোন হবে। সাজ্জাদ কাদির লিখেছেন একবার দৈনিক বাংলায় লেখা জমা দিতে গিয়ে শুনলাম ফজল শাহাবুদ্দীন নাকি তাদের লিস্টে সর্বশেষ কবি। এর বাইরে অন্য কারো কবিতা ছাপানো যাবে না। বলা বাহুল্য, এই ধরনের উক্তি যে কোন তরুণ কবির জন্য তাজ্জব কথা বলে বিবেচিত হবে। মোয়া মুড়কির মতন কবিতা ছাপানোর ফ্যাসান সম্ভবত স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শুরু হয়েছে। কিন্তু তার আগে একটা সময় ছিলো হুমায়ূন কবীর যখন কোন তরুণ কবির কবিতা ‘চতুরঙ্গে’ ছাপাতেন কিংবা বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশ হলে পাঠক মহলে রীতিমত আলোড়ন তুলতো। তার কারণ ছিলো, দুজনেই ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। তাদের যোগ্যতা নিয়ে পাঠক মহলে তেমন কোন প্রশ্ন উঠতো না। সবচেয়ে বড় কথা ডান বাম এই দুই সম্প্রদায়েরই ভালো কবিতা এই দুই পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। বুদ্বদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার পাশাপাশি বিষ্ণু দে’র এমনকি মঙ্গলাচরণ চট্টপাধ্যায়ের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থের উপর মনোরম, সপ্রংশস দীর্ঘ আলোচনা করেন, বলা যায় যে ঐ সমালোচনার বদৌলতেই সুভাষের প্রতিষ্ঠা অর্জিত হয়ে যায়। হায়! সেই রামও নেই, আর অযোধ্যাও নেই। যে কাজ আল মাহমুদ করলেও শামসুর রহমান করেননি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা গদ্য কবিতার ভঙ্গিই তরুণ কবিদের এই অরাজকতার সুযোগ করে দিয়েছে। গদ্য ছন্দের প্রকৃতিকে সুধীন দত্তের ভাষায় বাক সর্বস্ব ভূতের ভাষা(মোহিতলাল মজুমদার ও সুধীদ দত্ত একটিও গদ্য কবিতা লেখেননি।) এই মূল্যবান তথ্য অনেক কবির জানা দরকার বলেই উল্লেখ করলাম। ছন্দে কবিতা লেখে প্রতিষ্ঠা হওয়ার প্রচলিত ইতিহাস আমাদের কাব্য সাহিত্যে ভুরি ভুরি। তরুণদের গদ্যছন্দের অপব্যবহার এক কথঅয় অজ্ঞতার পরিচয় বললে ভঅলো হয়। কবিতা লেখঅর জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন, এই তথ্য এখন অবধি অনেকের কাছে হাস্যাস্পদ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাধারণ পাঠকদের সোজা সাপটা উত্তর এরকম কবিতা আমরা লিখতে পারি। লিখিনি তাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই বিশ্বাস নষে।টর মূলে বিশিষ্ট কবিদের সাথে অপকবিরাও দায়ী। আমার এই মন্তব্য অনেকের কাছে রুঢ় রুদ্র বলে মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে আমি অনন্যোপায়। অবশ্য অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন কবিতা কারা লিখবেন? এর উত্তর তো জীবনানন্দ দাশ অনেক আগেই দিয়ে গেছেন, ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধ গ্রন্থ থেকে খানিকটা তুলে ধরলে আমার বক্তব্য পরিস্কার হবে। আধুনিক কবিতার এই ‘প্রতীক পুরুষ’ বলেছেন, “শুধুমাত্র যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও ভেতরের চিন্তা ও অজ্ঞিতার সারবক্তা রয়েছে।”
তাহলে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে কবিতা সৃজন করাটা কোন যদু মদুর কাজনয়। কারণ যদু মদুরা ক্লাসিক উপন্যাস পাঠ করার পরিবর্তে হৈ হুল্লোড় ও দম্পতি মৈথুন ও সন্তানের কল্যাণ কামনায় সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতি। সুতরাং তাদের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র কথঅটির কোন মূল্য নেই। আবার যদু মধুর অভিজ্ঞতা যদি বিশাল হয়, সেটিও প্রকাশের ক্ষশতা রাখতে হবে। কারণ: রবীন্দ্রনাথের ভাষায় নীরব কবির মূল্য নেই। একবার আমাদের খ্যাতিমান কথা শিল্পী হাসান আজিজুল হক একবার মরহুম কায়েস আহমেদকে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, তার পিতা যদি লিখতেন তাহলে তারাশংকর হতে পারতেন। ঐ কথাশিল্পী তার পিতার অজ্ঞিতার পরিধি বর্ণনা করার জন্য এই উক্তি করেছিলেন। এই জন্য বলছিলাম, কবিতা সৃজন করতে হলে অনেক বস্তু গ্রহণের ক্ষমতা থাকতে হবে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, আজকের অধিকাংশ তরুণ কবির সেই ক্ষমতা নেই। গদ্য লেখার পরিবর্তে কবিতা লেখাকে সহজ বলে গ্রহণ করছেন। আর এই জন্য তারা ছন্দ, এমনকি অগ্রজ কবির মূর্খ সমালোচনা করতে দ্বিধা করেন না। সেই সঙ্গে আমাদেরও দুর্ভাগ্য যে বুদ্ধদেব বসু ও হুমায়ূন কবীরের মত সাহিত্য সম্পাদক আমাদের জামানায় নেই। থাকলে কবি কর্মীরা একটু ছায়া সম্বলিত আশ্রয় খুঁজে পেতেন। মনে রাখতে হবে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছন্দ রয়েছে। ছন্দ-তালহীন উদ্ভট বক্তব্য চিরকালই প্রত্যাখঅনের পাত্রে পরিণত হয়েছে। অতএব, কবিবৃন্দ ছন্দকে কবিতার গলায় আত্মহত্যার রশ্মি তৈরি করার পরিবর্তে প্রকৃত কবিতা লেখার মনোনিবেশ করুন। তাতেই কবিতার প্রকৃত মান মর্যাদা রক্ষিত হবে।

 

আপনার ওয়েবসাইট তৈরি করতে ক্লিক করুন........
Ads by জনতার বাণী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

শিরোনামঃ